Thursday, September 24, 2015

মছব্বির চৌধুরীর জীবনের প্রয়োজনীয়তা

মছব্বির চৌধুরীর জীবনের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে এখন গ্রীষ্মকালে ভীষন গরম পরে।
মুরব্বীরা বলেন  আগে এমন গরম ছিল না।
বিজ্ঞানীরা বলেন উন্নত বিশ্বে কলকারখানার সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইডের অধিকত্বে গ্রীন হাউস এফেক্টের কারনে পৃথিবীর আকাশের ওজন স্তর ধংশ হয়ে যাচ্ছে।ওজন স্তরে ফাটল ধরেছে।সে ফাটল গলে সূর্যের আলোর আতি বেগুনী রশ্মি সহ অন্যান্য ক্ষতিকারক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসছে ওজন স্তরে ফাটল ধরায় ছাঁকনি হিসাবে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি গুলো আটকাতে পারছে না । পৃথিবীর ছাঁকনী ওজন স্তর ।তাপমাত্রা বাড়ছে ।অনাকাঙ্খিত টর্নেডো সাইক্লোন হচ্ছে ।মারা যা্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ ।মিলিয়ন বিলিয়ন সম্পদ নষ্ট হচ্ছে ।বলা হচ্ছে এই বাড়ন্ত তাপমাত্রার জন্য উত্তর মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে,বাড়ছে সমূদ্র পৃষ্টের উচ্চতা !ফলে সমুদ্র পৃষ্টতল সমউচ্চতার দেশ বাংলাদেশ মালদ্বীপ এসমস্ত দেশ তলিয়ে যেতে পারে সাগরের লোনা জলে।
আজকের রোদের তেজটা যেনো একটু বেশী ।গরমটা অসহনীয়।
এরকম অসহনীয় গরমের মধ্যে মছব্বির চৌধুরী ছাতি মাথায় বাজারের দিকে হেঁঠে যাচ্ছিলেন আর এই গরমের কথাই ভাবছিলেন।
গরমে তাঁকে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল।
এমন সময় একটি সুন্দর গাড়ী উনার পাশ দিয়ে কিছু ধূলা ধূয়া উড়িয়ে ভোস্ করে চলে গেল ।
তিনি চেয়ে  দেখলেন গাড়ীটির কাঁচ নামানো ।
নিশ্চই গাড়ীটিতে ইয়ার কন্ডিশন আছে ।ভাবলেন তিনি।
আজকাল শহরের বড় বড় বিপনী বিতান গুলোতে ইয়ার কন্ডিশন সিষ্টেম  থাকে।কী শীতল শীতল আরাম দায়ক ব্যবস্থা !ভাবলেন মছব্বির চৌধুরী।ছেলে বেলার সেই পুকুর পাড়ের আমবাগনের সমীরণও আরাম দায়ক ছিল।যেখানে তিনি স্কুল ছুটির দিনে গরমের সময় বর্ষায় পুকুরের বাড়ন্ত পানিতে  প্রায়ইশ ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন ।তখন প্রচুর মাছ ধরা পরতো কই, শিং ,মাগুর ,পুঁটি কতো কি!তাঁর মনে হলো ইয়ার কন্ডিশনের শীতলতার তুলনায় ছেলেবেলার সেই পুকুর পাড়ের  পরিবেশ অধিক মনোহর ও আরাম দায়ক ছিল।ইয়ারকন্ডিশনের বাতাসে যান্ত্রিক গন্ধ থাকে ।আর আম বাগানের বাতাশে অনেক না জানা সুঘ্রাণ ছিল।আর মুকুলের সুগন্ধ মনকে মাতোয়ারা করে দিতো্ ।
একসময় বেঁচে থাকার প্রয়োজনের তাগিদে তাঁদের একান্নভূক্ত পরিবার ভেংগে গেল।বাপ চাচারা জমি জমা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন।সকলের ব্যবহারের সুবিধার্থে পুকুর আর আম বাগান ভাগ হলো না।এজমালি রয়ে গেল ।এজমালি আমবাগান প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কেটে সাফ হয়ে গেল ।সেখানে আজ স্থান হয়েছে বাড়ন্ত জমিদার বংশধরদের বসত বাড়ী।হাড়িয়ে গেল  সুখস্মৃতি।হাড়িয়ে গেল আম বাগান আর হাড়িয়ে গেল সেই মন মাতানো গাঁ জুড়ানো শীতল সমীরণ।
এখন চারি দিকে ঘর বাড়ী সরু সরু চলাচলের রাস্তা ।সে রাস্তায় দুজন পাশাপাশি চলাচলে মুস্কিল । যেনো দম ফেলা দায়।মছব্বির চৌধুরী নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।ভাবলেন শৈশব সুখ স্মৃতির সবকিছু হাড়িয়ে যায় কেন ?
শৈশবের স্মৃতিময় খেলা ধূলা আজ বিলুপ্তির পথে ।আজ আর খেলতে দেখা যায় নাদাড়িয়াবাঁধাগোল্লা ছুট বউচোর মতো শৈশবের সেই মন মাতানো খেলাগু ।ছেলেপুলে গুলো খোরা ধূলা ছেড়ে ব্যস্ত মোবাইল ফেসবুক নিয়ে ।খেলা ধূলা সামাজিকতা আজ বন্ধী হতে চলেছে মোবাইলের ছোট্ট ফ্রেমে !বিমর্ষ হয়ে ভাবলেন মছব্বির চৈাধুরী ।
জমি জিরেত বিক্রী করতে করতে শেষ হয়ে গেছে।জমিগুলো অধিকাংশ কিনে নিয়েছে একদা যারা তাঁদের বাড়ীতে কামলা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।তাদের মধ্যে একজন রহিম মিয়ার পূত্র গনি মিয়া্ ।তার বাজারে বাজে মালের বিরাট ব্যবসা ।আর আছে একটি বড় ট্রাক দুটি মাহিন্দ্র ট্রাকটর ।আছে কয়েকটি পাওয়ার টিলার ।
গরু গাভী আগে প্রতি গৃহ্থের ঘরে ঘরে শোভা পেতো ।গৃহস্থ ঘরের আঙ্গিনার শোভা বর্ধন করতো খড়ের বড় বড় গাদা বা লাছি।বেশী বড় লাছিতে প্রমাণ হতো জমিদার তালুকদারের চিহ্ন। এখন তেমন আর দেখা যায় না।গরু চড়ানোর জায়গাও বিলুপ্ত হতে চলেছে ।ভূমিহীনদের সরকারী খাস জমি বন্দোবস্তের নামে অধিকাংশ চলে গেছে গণি মিয়াদের মতো লোকদের দখলে।একদা গরীব রহিম মিয়ার পূত্র গণি মিয়া আজ অনেক টাকার মালিক।গ্রামে গঞ্জে এখন বলদ দিয়ে চাষাবাদ করা উঠে গেছে।কাকভোরে শুনা যায় না চাষিদের হেই হেই হট হট মধুর সূরের চাষার বলদদের পরিচালনার  কন্ঠ।তার বদলে বাতাসে ভেসে আসে পাউয়ার টিলারের একগেয়ে বিরামহীন শব্দ।এলাকার গৃহস্থরা গণি মিয়ার পাওয়ার টিলার ভাড়া নিয়ে জমি চাষ করেন।অন্যদের মতো মছব্বির চৌধুরীও নিজের জমি চাষ করার জন্য গনি মিয়ার পাওয়ার টিলা ভাড়া নেন।গণি মিয়া লোকটা খাড়াপ না ।যথেষ্ট অমায়িক বাপের মতো মান্য চিহ্ন আছে তার স্বভাবে।তার এরূপ স্বভাবের জন্য জন্য মছব্বির চৌধুরী গণি মিয়াকে পছন্দ করেন।
কী যেনো ভাবছিলেন ।স্মরণ করতে চেষ্ট করলেন মছব্বির চৌধুরী ।হাঁ গাড়ী ! তাঁরও এমন একটি গাড়ী থাকতে পারতো।
বৃটিশদের জমিদারী উচ্ছেদ আইনের কারণে আজ তাঁদের মতো অভিজাতদের পতন হয়েছে।তাঁর বাবার আমল হতে আর্থিক সংস্থানের বিষয়াদি কমতে শুরু করে।অর্থাভাবে তাঁদের বিলাসিতাকে ক্রমশ সংকোচিত করে ফেলেছিল।কিন্তু তা বলা বা প্রকাশ করা যেতো না আভিজাত্যের কারণে।বলতে না পারা এ আরেক অন্য ধরণের কষ্ট।তবু বাবা আভিজাত্য ছাড়েননি।আকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন মনে প্রাণে।তিনিও বাবার তথা পারিবারিক ঐতিয্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন ।কাউকে বুঝতে দেননি অভাব অনাটনের কথা।বাবার মুখে শুনেছেন কোন এক জমিদার বংশের ব্যক্তি জমা জমি বিক্রী করে নি:শ্ব হয়ে গিয়েছিলেন।তিনি জীবন ধারণের জন্য তাঁর সাবেক প্রজাদের যারা জমিদারী উচ্ছেদ আইনের কারণে সচ্ছল হয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে ঘোড়ায় চরে ভিক্ষা করতেন।এমনি ছিল জমিদারী বংশের জ্ঞাতাভিমান।
 লোকে বলে জমিদাররা অত্যাচারী ছিল।অত্যাচারিত মানুষের অভিশাপে জমিদারদের পতন হয়েছে।কিন্তু লোকে এটা জানে না ইংরেজদের খাজনা তোলার জন্যই জমিদারদের অত্যাচারী হতে হতো।না হলে জমিদারী লাটে উঠবে যে।জনগণ অত্যাচারিত হলো ।লাভ হলো ইংরেজদের ।বৃটিশরা  আজও  ধনী ।দেশের মানুষ গরীব হলো ,নি:শ্ব হলো।দোষ হলো দেশীয় জমিদারদের ।কিন্তু ইংরেজরা কেন দোষী হলো না।কারণ ইংরেজরা ছিল পরদেশী।এদেশ ছিল তাদের লাভের স্থান,ব্যবসা করে ধনী হবার উপলক্ষ।জমিদার শ্রেণী ইংরেজরাই তৈরী করে তাঁদের সুবিধার জন্য।দেশের ধনী জমিদাররা ইংরেজদের সহযোগী হিসাবে অত্যাচারী হয়ে উঠে!তাই ইংরেজদের যেনো কোন দোষ না থাকে সেজন্য আইন করে উচ্ছেদ করে যায় তাঁদেরই তৈরী করা জমিদারদের।আজো সেই ইংরেজ পদ্ধতির শাসনের আইনের পথেই দেশ চলছে ।তাহলে জমিদারদের কি দোষ ছিল ?ইংরেজদের সেই চাপিয়ে দেয়া আইনে আজকের দেশে শান্তি সমৃদ্ধি হবে কি করে ?তিনি ভেবে পান না।এক পর্যায়ে ভাবনার হাল ছেড়ে দেন।
এই বিষয়ে সন্দেহের দানা ক্রমশ গড়াগড়ি দেয় মছব্বির চৌধুরীর মনে।মনে পড়ে যায় এক বাংলাদেশীয় বৃটিশ এমবাসেডর বলেছিলেন,
“-বৃটিশদের ডাষ্ট বিনে ফেলে দেয়া আইনে চলছে বাংলাদেশ ।”
বাংলাদেশে জমিদারদের সৃষ্টি করে ধ্বংশ করেছে বৃটিশরা আবার নিজ দেশে রাজতন্ত্র।জমিদারী আর রাজতন্দ্র কি সমার্থক নয় ?বৃটিশরা রানীর শাসন ও রাণীকে শ্রদ্ধা করে সেই আদ্যিকাল হতে ।এই পর্যায়ে এসে মছব্বির চৌধুরী চিন্তা খেই হাড়িয়ে ফেলেন।উনি উপলদ্ধি করলেন যে,আজকাল তাঁর সবকিছু মনে থাকে না।আগেরটা পরে :পরেরটা আগে চলে আসে ।উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত তথ্য মনে করতে পারেন না ।সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়।কোথায় গাড়ী নিয়ে ভাবছিলেন ।তা নয়,এক লহমায় মনের ভাবনা কোথা থেকে কোথায় চলে যায় !এ কথা ভেবে তিনি দিশা পান না।আজকাল মনটা অদ্ভুদ খেয়ালী আচরণ করছে ।বয়স বাড়ছে।বয়স বাড়লে সবারই কি এমন হয়।নাকি শুধু উনারই এমন হচ্ছে ।ভেবে কূল কিনারা পান না তিনি।যেমন শৈশবে বাড়ীর পাশে নদীটির কথা ভেবে কূল কিনারা পেতেন না তিনি।
নদীটি আসলো কোথা থেকে
  কোথায় চলে যায়
 কচুরীপানা ভেসে ভেসে কোথায় চলে যায়?
নদীর শেষ কোথায়?
বাবা ইয়াছির চৌধুরীকে প্রশ্ন করে জানতে পেরেছিলেন নদী সাগরে গিয়ে শেষ হয় ।
-সাগর কতো দূরে বাবা ?
 -সাগর অনেক অনেক দূরে ।সাগর অনেক বড় বাছা।বড় হলে জানতে পারবে!
স্নেহের পূত্রের ব্যাকুল প্রশ্নমালার উত্তরে বলতেন বাবা ইয়াছির চৌধুরী ।ইয়াছির চৌধুরী বেঁচে ছিলেন ৯৮ বছর ।মৃত্যুর শেষ সময় পর্যন্ত হাঁটতে পারতেন লাঠিতে ভর দিয়ে চোখেও ভাল দেখতে পারতেন ।বা অনেক গল্প করতেন ।বাবা নদীর কথা বলতেন।গল্পগুলো ছিল বেশীর ভাগ মাছ বিষয়ক ।যেমন নদীর মাছ গুলো বিশাল ছিল ।আর খেতে খুব সুস্বাদু ছিল।জেলেরা  প্রচুর মাছ ধরতো,বড় মাছ গুলো নিয়ে আসতো জমিদার বাড়ীতে বেশী দাম পাবে বলে।তাঁর বাবা শরফুদ্দীন চৌধুরীর নির্দেশও ছিলো সেরকমই।শরফুদ্দীন চৌধুরীকে ভীষন ভয় ও সমীহ করতো এলাকার মানুষ। দাদা শরফুদ্দীন চৌধুরীকে ভীষণ ভয় পেতেন মছব্বির চৌধুরীও।যেনো রূপকথার আজব কোনো বুড়ো  কুজোঁ হয়ে লাটিতে ভর দিয়ে জীবন্ত চলা ফেরা করছেন।মোটা উত্তল লেন্সের চশমা পড়তেন তিনি।চশমার ভিতর চোখ গুলো দেখা যেতো বড়ো বড়ো দৈত্যের চোখের মতো।তাই দেখে ভয় পেতেন মছব্বির চৌধুরী ।আর লাঠি আর কুজোঁ হয়ে চলার অবয়ব আরো ভীতির কারণ হতো মছব্বির চৌধুরী কাছে।গরমের দিন পুকুরে নেমে ই্ছে মতো ঘন্টার পর ঘন্টা দাপাদাপি করতেন।এজন্য জ্বরে পরে ভূগতেও হতো কিছুদিন। কারো কথা শুনতেন না তিনি ।কিন্তু দাদা এসে একটু ধমক দিলে ভয়ে উঠে পরতেন,কোন টু শব্দ না করে।কারণ দাদাকে তিনি ভীষণ ভয় পেতেন।আর দাদীকে ভীষণ ভালবাসতেন মজার মজার গল্প বলার জন্য।
বাবা ইয়াছির চৌধুরী নদী ও মাছের গল্প শুনে তিনি ভাবতেন,বড় হয়ে বাবাকে অনেক বড় বড় মাছ খাওয়াবেন ।স্কুল মাষ্টারীর চাকুরীর প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বড় একটি রুই মাছ আনিয়েছিলেন বিল থেকে।একদম তাঁজা মাছ।আর নিয়েছিলেন মিষ্টি ।কারণ বাবা মাছ মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন।মায়ের হাতের রান্নায় মাছটির স্বা হয়েছিল অমৃত ।মায়ের হাতের অসাধারণ রান্নর স্বাদ  আজো মনে হয় তাঁর ।কিন্তু সেদিন বাবা খাবার পর বলেছিলেন মাছটি খেতে সুস্বাধু হলেও ;সেই ছেলেবেলার নদীর মাছের মতো সুস্বাদু নয়।তা শুনে মছব্বির চৌধুরী ভাবতেন বাবার ছেলেবেলার খাওয়া মাছ নিশ্চই অতিশয় সুস্বাদু ছিল।
মাছদের মধ্যে ইলিশ মাছ মছব্বির চৌধুরীর অতি প্রিয় একটি মাছ।ছেলেবেলায় যে ইলিশ মাছ খেয়েছেন তার স্বাধ ও গন্ধ এখনো মনে পরে।এখনকার ইলিশে সেই স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যায় না।যদিও রকিবের আম্মার রান্নার হাত ভালো।কারণ এখন মাছে দেয়া হয় ফর্মালিন ! স্বাদ কোথায় থাকবে ?
ছেলে রকিব চৌধুরী ।লন্ডন প্রবাসী।ইন্টার মিডিয়েট পাশের পর বিয়ে দিয়েছিলেন লন্ডনী ফ্যামিলীতে।বিয়েতে তিনি রাজী ছিলেন না।তাঁর ইচ্ছা ছিল, ছেলে পড়া লেখা করে ম্যাজিষ্ট্রেট, জেলা কালেক্টর হবেন ।জেলা কালেক্টরের অনেক ক্ষমতা।আরেকটি  কারণ মেয়ের পরিবারের পূর্ব পূরুষ একদা লন্ডনী ভাউচারে  গিয়ে ধনী হবার আগে মাটির জিনিস পত্র কলসি,মটকা সানকি ইত্যাদি নৌকায় ভরে গ্রামে গঞ্জে ফেরী করে বিক্রী করে জীবিকা নির্বাহ করতো ।কিন্তু মেয়ের ছেলে দেখে পছন্দ হয়েছে ।এজন্য ঘটকও পাঠিয়েছেন ।মেয়ের পক্ষ হতে ঘটকালী ।কি কলিকাল ।মেয়ে পক্ষের বাবা মা এসে বুঝালেন,মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্য আত্মীয় স্বজনের পক্ষ হতে বিস্তর চাপ আসছে।তাঁদের ছেলে কোন অংশে কম?সকলে লন্ডনী মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যত জীবন দেখতে চায়।কিন্তু মেয়ের কাউকে পছন্দ নয়্ বিয়ে করতে রাজী নয়।জর করে বিয়ে দিলে,লন্ডনে গিয়ে ডিভোর্স হয়ে যেতে পারে ।এতে মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে ।বাপ মা হিসাবে তারা এমনোক তারা তা কখনো চান না।মেয়ের পছন্দ তাঁর ছেলেকে্।আলাপ চারিতায় জানতে পারলেন এঁরা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন।স্ত্রীও সায় দিলেন।অগত্যা রাজী হতে হলো মছব্বির চৌধুরীকে ।
সেই ছেলে ইংরেজ দেশে গিয়ে সংসারের খরচের টাকা পাঠাচ্ছেন।তার ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছে।যে ইংরেজদের জন্য তাঁর বংশের উত্থান পতন!বড়ই অদ্ভুদ এই দুনিয়া!ভাবলেন মছব্বির চৌধুরী ।
মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।সরকারী দলের দুগ্রুপ ছাত্রের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।একজন ছাত্র মারা গেছে । বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনিদৃষ্ট কালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ্ ঘোষনা করেছেন ।তিনি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকেন,কখন কি হয়ে যায় !সায়মা সবসময় বাবাকে চিন্তা না করার জন্য বলে।কিন্তু সন্তানের জন্য বাবা মায়ের চিন্তার কি শেষ হয় !মেয়ে আসছে বাড়ীতে।আদরের মেয়ের জন্য ভাল মন্দ খাওয়ার ব্যবস্থার  জন্য তিনি বাজারে যাচ্ছেন।রকিবকে ম্যাজিষ্ট্রেট করতে পারেন নি।সায়মা এখন একমাত্র ভরসা।সায়মা চৌধুরী লেখাপড়ায় খুব মেধাবী।সে ম্যাজিষ্টে হতে পারবে এ ব্যাপারে মছব্বির চৌধুরী নিশ্চিত । কিন্তু তিনি আজকাল শুনতে পান বি সি এস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় ।চাকুরী পেতে হলে মন্ত্রী এমপির সুপারিশ লাগে।এই ভাবনায় এসে তাঁর মনে খটকা লাগে।এমন খটকার জটিলতা  থেকে তাঁর মন বের হতে পারে না।তিনি হতাশ হন।

শিশু মছব্বির চৌধুরীর এর কাছে কামলা আব্দুল ভাই ছিল পছন্দের লোক ।আব্দুল ভাইকে একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-‘দাদা এমন কুঁজো হয়ে চলেন কেন ?’
আব্দুল উত্তরে বললেন, -‘তিনার বাতাশ লাগছে।’
-‘কি বাতাশ ?’
-‘দেঁওয়ের বাতাশ।হেই বাতাশ লাগার কারনে তিনি কুঁজো হয়ে গেছেন।’
বলেছিলেন আব্দুল।
-‘দেঁও কি ?’
-‘দেঁও খুব খাড়াপ ,গাঁয়ে খুব শক্তি দেঁওয়ের ।মানুষকে কাতুকুতু দেয় ,এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।’
বলেছিলেন কামলা আব্দুল ভাই।
সেদিন আব্দুল ভাইয়ের কথা শুনে দাদার ব্যাপারে ভয়ের মাত্রাটা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
যখন তিনি আরেকটু বড় হয়ে কিশোর বয়সে উপনীত হলেন তখন থেকে দাদাকে আর ভয় লাগতো না। বরং দাদা হয়ে উঠেছিলেন  একজন পূরানো দিনের গল্পবলা প্রিয় বুড়ো । বন্ধু জন।সে সময় দাদা আপন হয়ে গেলেন আর বাবাকে ভয় পেতে থাকলেন।বাবা পড়াশুনার খবর নিতেন,উপদেশ দিতেন,যদিও বাবার উপদেশগুলো ভাল লাগতো না ,চলা ফেরায় কোন ব্যত্যয় ঘটলে বাবা কৈফিয়ত চাইতেন।অনেক সময় তাঁর কৈফিয়তের সদোত্তর দেয় সম্ভব হতো না।মনে হতো বাবা তার স্বাধীন ভাবে চলাফেরায় অযথা হস্তক্ষেপ করছেন।কিন্তু বাবার উপদেশগুলো ফেলে দেয়া যেতো না।এ কারণে বাবাকে ভয় পেতেন ।পরে যখন মাষ্টারীর চাকরী পেয়ে  নিজের পায়ে দাড়িয়ে যান ,তখন বাবা প্রিয়জন হয়ে যান,উনাকে ভয় পাবার কিছু থাকে না।কেন বাবা শাসন করতেন বা তিনি বাবাকে বয় পেতেন সেগুলোর উত্তর পেয়ে যান তখন।দাদা বলেছিলেন তাঁর কোমড়ে বাতের ব্যাঁথার সমস্যার কারণে কুঁজো হয়ে চলতে হয়।
কিন্তু তিনি আজও আব্দুল ভাইয়ের বলা বাতাস লাগা বিষয়টি মিমাংসা করতে পারেননি।
কারণ গ্রামের কিছু মানুষের কাছে আজো বাতাস লাগা বিষয়টি বিশ্বাসের স্থান দখল করে আছে।এ রহস্য হয়তো ভেদ করা যাবে না।

 জমিদারদের বিশ্বাস ছিল তাঁদের জমিদারী বংশপরস্পরায় চলতে থাকবে।
এক কালে তাঁর পূর্ব পূরুষেরা প্রতাবশালী জমিদার ছিলেন।সম্পদের কোন অভাব ছিল না।যদি বৃটিশরা আইন করে জমিদারী উচ্ছেদ না করতো তাহলে তিনিও হয়তো আজ উত্তরাধিকারী সূত্রে বিরাট ধনী হতেন।এমন একটি গাড়ী তিনি কিনতে পারতেন অনায়াশে।ভাবলেন মুছব্বির চৌধুরী।গণি মিয়ার  কি গাড়ী কিনার সামর্থ্য আছে?থাকতেও পারে । কিন্তু গণি মিয়া গাড়ী কিনবে না ।সে খুব পরশ্রমী লোক।তার আরো টাকার প্রয়োজন,বিলাসিতা করার মানষিকতা গণি মিয়ার নেই।তিনি কল্পনা করে দেখলেন গণি মিয়া গাড়ী করে এসে আদাবের সাথে বলছে,
-সালামালাইকুম,চৌধূরী সাব !হেঁটে যাচ্ছেন যে!আসেন আমার গাড়ীতে উঠেন,আপনাকে পৌঁছে দেই।
নাহ্ !গণি মিয়াকে গাড়ীতে মোটেই মানাচ্ছে না।ভাবলেন তিনি।
কিন্তু এমন একটি গাড়ী কিনার টাকা তাঁর কাছে নেই।
একজন অবসর প্রাপ্ত প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকের অতো টাকা থাকবে কি করে !
লটারীতে টাকা পেলে হয়তো একটি গাড়ী কিনা যেতো।
গাড়ী কিনলে আবার চালানোর জন্য ড্রাইভার প্রয়োজন।
দিতে হবে মাসোহাড়া বেতন !তেল মবিল আরো কতো কি
একটু আগের চলে যাওয়া গাড়ীটার মালিক নিশ্চই ধনী লোক।ধনী লোকেরা গাড়ী কিনে শুধু আরাম আয়েশ বিলাসিতার জন্য?তা হয়তো নয় ।
ব্যবসায়ী মাত্র ধনী লোক ।ধনী লোকেদের ব্যবসার জন্য এখানে সেখানে যেতে হয় এজন্য সময় বাঁচানোর গাড়ী প্রয়োজন।আর বড় চাকুরীর কর্মকর্তাদের গাড়ী প্রয়োজন ।মূল্যবান সময় বাঁচানোর জন্য।
কিন্তু তাঁর কি গাড়ীর প্রয়োজন আছে? ভাবলেন মুছাব্বির চৌধুরী ।
কোথায় যেনো পড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কোন এক চাকুরে বেশ কিছু কিলোমিটার পায়ে হেঁটে প্রতিদিন অফিস করতেন ।যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে পায়ে হেঁটে অফিস করা বিষয়টি একটি অবাক করা ঘটনা।ভদ্রলোকের গাড়ী কিনার টাকা ছিল  না।আরেক ভারতীয় স্কুল মাষ্টার কয়েক কিলোমিটার সাঁতরিয়ে ছাত্রদের পড়াতে আসতেন স্কুলে।নাহ্! সে তোলনায় তিনি ভালই আছেনে!
এদিকে রিক্সা তেমন একটা চলে না ।তাই আজকের গরমে একটু কষ্ট বেশী হচ্ছে মুছব্বির চৌধুরীর ।তাছাড়া ডায়বেটিশ হার্টের সমস্যা আছে মছব্বির চৌধুরীর ।তাই হাঁটা প্রয়োজন।শরীরটা হলো বাইসাইকেলের মতো ।সব সময় তেল মবিল দিয়ে চালু রাথতে হয় ।ফেলে রাখলে জং ধরে অকেজো হয়ে পরতে পারে।ভাবলেন তিনি।ভারতীয় স্কুল মাষ্টার অথবা যুক্তরাষ্ট্রের ভদ্রলোকের  কথা ভেবে তিনি শান্তনা পেলেন।কারণ তাঁরা কখনো বলেননি তাঁদের কষ্ট হচ্ছে বরং তাঁরা যেনো এরূপ জীবন উপভোগ করছেন।
আসলে তাঁর গাড়ীর প্রয়োজন নেই বলেই গাড়ী নেই ।
এমন যুক্তির কথা ভেবে তাঁর বিষন্ন মনটা খুশী হয়ে উঠলো ।
ঘটনাটা ঘটলো ঠিক সে সময়!
পিছন থেকে গণি মিয়ার ট্রাক্টরের ষ্টিল বডির কোনা মছব্বির চৌধুরীর মেরুদন্ডে সজোরে আঘাত করলো। তিনি পিঠে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে ছিটকে পড়লেন কার্লভার্টের কার্নিশে।ভীষণ জোরে মাথা ঠুকে গেল কার্লভার্টের কার্নিশে।তারপর হাত পা ছড়িয়ে পরলেন স্বল্প পানির নিচের খালটিতে ।ঘটনার আকশ্মিকতায় গণি মিয়া হতভম্ব হয়ে গেলেন ।কয়েকদিন যাবত ট্রাক্টরটিতে ব্রেক কাজ করছিল না ব্রেক সারাতেই বাজারে নিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাক্টরটিকে।চারিদিকে একটা হৈই চৈই রব শুনা গেল ।মছব্বির চৌধুরী চিত হয়ে নি:সাড় দেহে হাত পা ছড়িয়ে পরে রয়েছেন অল্প পানির খালে ।তিনি হৈই চৈই শুনতে পাচ্ছিলেন ।শুরুতে তীব্র ব্যথার অনুভূতি পেলেও এখন তিনি ব্যাথার অনুভূতি পাচ্ছিলেন না বরং শরীরটা হালকা হালকা আরাম দায়ক লাগছিল।নীল আকাশে একটি চীলকে বৃত্তাকারে উড়তে দেখতে পাচ্ছিলেন।চিলটি যেনো অনন্তকাল ধরে উড়ছে। দেখতে ভাল লাগছিল।হঠা করে তিনি উপলদ্ধি করলেনদুনিয়া কিছুই নাস্ত্রী সন্তান আত্মীয় স্বজন সমস্তই দুনিয়ার মায়া।তিনি এখন সে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত!গাড়ীর যেমন প্রয়োজন নেই বলে ছিল না ,বলে মনটা খুশী হয়েছিল।তেমনি এখন পৃথিবীর কোন কিছুই প্রয়োজন নেই মানে করে ভাল লাগার অনুভূতি হল।তিনি অপার এক ভাল লাগার ঘোরে আচ্ছন্ন হলেন।পৃথিবীর যাবতীয় প্রয়োজনহীনতা তাঁকে অজানা এক প্রচন্ড সুখ বোধে আচ্ছন্ন করলো ।তিনি আকাশের উড়ন্ত চিলটিকে একই ভাবে বার বার উড়তে দেখতে পেলেন।
মছব্বির চৌধুরী এলাকার মানী লোক,  সবাই ধরাধরি করে গণি মিয়ার ট্রাক্টরে তোলে হাসপাতালে নিয়ে আসলেন।ডাক্তার আসলেন।এখন মছব্বির চৌধুরীর চোখে উড়ন্ত চিলের বদলে হাসপাতালের সাদা ছাদ ।সেখানে দু একটি মাকড়সার জাল দেখতে পেলেন।শিকার ধরার জন্য ,বেচেঁ থাকার জন্য কী প্রানন্ত প্রচেষ্টা মাকড়সাদের!আগে কখনো এভাবে দেখতে পাননি কেন ? তাদের কথা এভাবে ভাবতে পারেননি কেন ?তিনি কি অন্য জগতে চলে এসেছেন।যেখানে চিন্তা ভাবনা অন্য রকম ?
তিনি শুনতে পেলেন ডাক্তার যেনো অনেক দূর থেকে বলছেন 
“–ইনি এক্সিডেন্টের সংগে সংগেই মারা গেছেন।?”
উপস্থিত জনেরা ইন্না লিল্লাহ পড়লেন ।
একজন এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে মছব্বির চৌধুরীর খোলা চোখ দুটোর চোখের পাতা ঢেকে দিলেন। মছব্বির চৌধুরী অন্দকার দেখলেনঅন্ধকারের পর্দায় সাড়া জীবনের ঘটনাগুলো ছায়াছবির মতো ভেসে উঠলো ।দাদা দাদী বাবা মা স্ত্রী সন্তান স্কুলের ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন লোকজন।তিনি অবাক আনন্দিত হলেন এই ভেবে তাঁর জীবনে কতো ঘটনাই না ঘটেছে,যেগুলো তিনি জানতেন না,তিনি ফেলে যাওয়া জীবনের ছায়াছবিতে মগ্ন হলেন।ক্রমশ লোকজনের কথাবার্তার ধ্বনী ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে লাগলো
 কে যেন একজন বললেন “ লোকটা অনেক ভালো ছিলেন!”
এক সময় তিনি চীরদিনের জন্য প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

Thursday, September 24, 2015

মছব্বির চৌধুরীর জীবনের প্রয়োজনীয়তা

মছব্বির চৌধুরীর জীবনের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে এখন গ্রীষ্মকালে ভীষন গরম পরে।
মুরব্বীরা বলেন  আগে এমন গরম ছিল না।
বিজ্ঞানীরা বলেন উন্নত বিশ্বে কলকারখানার সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইডের অধিকত্বে গ্রীন হাউস এফেক্টের কারনে পৃথিবীর আকাশের ওজন স্তর ধংশ হয়ে যাচ্ছে।ওজন স্তরে ফাটল ধরেছে।সে ফাটল গলে সূর্যের আলোর আতি বেগুনী রশ্মি সহ অন্যান্য ক্ষতিকারক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসছে ওজন স্তরে ফাটল ধরায় ছাঁকনি হিসাবে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি গুলো আটকাতে পারছে না । পৃথিবীর ছাঁকনী ওজন স্তর ।তাপমাত্রা বাড়ছে ।অনাকাঙ্খিত টর্নেডো সাইক্লোন হচ্ছে ।মারা যা্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ ।মিলিয়ন বিলিয়ন সম্পদ নষ্ট হচ্ছে ।বলা হচ্ছে এই বাড়ন্ত তাপমাত্রার জন্য উত্তর মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে,বাড়ছে সমূদ্র পৃষ্টের উচ্চতা !ফলে সমুদ্র পৃষ্টতল সমউচ্চতার দেশ বাংলাদেশ মালদ্বীপ এসমস্ত দেশ তলিয়ে যেতে পারে সাগরের লোনা জলে।
আজকের রোদের তেজটা যেনো একটু বেশী ।গরমটা অসহনীয়।
এরকম অসহনীয় গরমের মধ্যে মছব্বির চৌধুরী ছাতি মাথায় বাজারের দিকে হেঁঠে যাচ্ছিলেন আর এই গরমের কথাই ভাবছিলেন।
গরমে তাঁকে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল।
এমন সময় একটি সুন্দর গাড়ী উনার পাশ দিয়ে কিছু ধূলা ধূয়া উড়িয়ে ভোস্ করে চলে গেল ।
তিনি চেয়ে  দেখলেন গাড়ীটির কাঁচ নামানো ।
নিশ্চই গাড়ীটিতে ইয়ার কন্ডিশন আছে ।ভাবলেন তিনি।
আজকাল শহরের বড় বড় বিপনী বিতান গুলোতে ইয়ার কন্ডিশন সিষ্টেম  থাকে।কী শীতল শীতল আরাম দায়ক ব্যবস্থা !ভাবলেন মছব্বির চৌধুরী।ছেলে বেলার সেই পুকুর পাড়ের আমবাগনের সমীরণও আরাম দায়ক ছিল।যেখানে তিনি স্কুল ছুটির দিনে গরমের সময় বর্ষায় পুকুরের বাড়ন্ত পানিতে  প্রায়ইশ ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন ।তখন প্রচুর মাছ ধরা পরতো কই, শিং ,মাগুর ,পুঁটি কতো কি!তাঁর মনে হলো ইয়ার কন্ডিশনের শীতলতার তুলনায় ছেলেবেলার সেই পুকুর পাড়ের  পরিবেশ অধিক মনোহর ও আরাম দায়ক ছিল।ইয়ারকন্ডিশনের বাতাসে যান্ত্রিক গন্ধ থাকে ।আর আম বাগানের বাতাশে অনেক না জানা সুঘ্রাণ ছিল।আর মুকুলের সুগন্ধ মনকে মাতোয়ারা করে দিতো্ ।
একসময় বেঁচে থাকার প্রয়োজনের তাগিদে তাঁদের একান্নভূক্ত পরিবার ভেংগে গেল।বাপ চাচারা জমি জমা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন।সকলের ব্যবহারের সুবিধার্থে পুকুর আর আম বাগান ভাগ হলো না।এজমালি রয়ে গেল ।এজমালি আমবাগান প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কেটে সাফ হয়ে গেল ।সেখানে আজ স্থান হয়েছে বাড়ন্ত জমিদার বংশধরদের বসত বাড়ী।হাড়িয়ে গেল  সুখস্মৃতি।হাড়িয়ে গেল আম বাগান আর হাড়িয়ে গেল সেই মন মাতানো গাঁ জুড়ানো শীতল সমীরণ।
এখন চারি দিকে ঘর বাড়ী সরু সরু চলাচলের রাস্তা ।সে রাস্তায় দুজন পাশাপাশি চলাচলে মুস্কিল । যেনো দম ফেলা দায়।মছব্বির চৌধুরী নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।ভাবলেন শৈশব সুখ স্মৃতির সবকিছু হাড়িয়ে যায় কেন ?
শৈশবের স্মৃতিময় খেলা ধূলা আজ বিলুপ্তির পথে ।আজ আর খেলতে দেখা যায় নাদাড়িয়াবাঁধাগোল্লা ছুট বউচোর মতো শৈশবের সেই মন মাতানো খেলাগু ।ছেলেপুলে গুলো খোরা ধূলা ছেড়ে ব্যস্ত মোবাইল ফেসবুক নিয়ে ।খেলা ধূলা সামাজিকতা আজ বন্ধী হতে চলেছে মোবাইলের ছোট্ট ফ্রেমে !বিমর্ষ হয়ে ভাবলেন মছব্বির চৈাধুরী ।
জমি জিরেত বিক্রী করতে করতে শেষ হয়ে গেছে।জমিগুলো অধিকাংশ কিনে নিয়েছে একদা যারা তাঁদের বাড়ীতে কামলা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।তাদের মধ্যে একজন রহিম মিয়ার পূত্র গনি মিয়া্ ।তার বাজারে বাজে মালের বিরাট ব্যবসা ।আর আছে একটি বড় ট্রাক দুটি মাহিন্দ্র ট্রাকটর ।আছে কয়েকটি পাওয়ার টিলার ।
গরু গাভী আগে প্রতি গৃহ্থের ঘরে ঘরে শোভা পেতো ।গৃহস্থ ঘরের আঙ্গিনার শোভা বর্ধন করতো খড়ের বড় বড় গাদা বা লাছি।বেশী বড় লাছিতে প্রমাণ হতো জমিদার তালুকদারের চিহ্ন। এখন তেমন আর দেখা যায় না।গরু চড়ানোর জায়গাও বিলুপ্ত হতে চলেছে ।ভূমিহীনদের সরকারী খাস জমি বন্দোবস্তের নামে অধিকাংশ চলে গেছে গণি মিয়াদের মতো লোকদের দখলে।একদা গরীব রহিম মিয়ার পূত্র গণি মিয়া আজ অনেক টাকার মালিক।গ্রামে গঞ্জে এখন বলদ দিয়ে চাষাবাদ করা উঠে গেছে।কাকভোরে শুনা যায় না চাষিদের হেই হেই হট হট মধুর সূরের চাষার বলদদের পরিচালনার  কন্ঠ।তার বদলে বাতাসে ভেসে আসে পাউয়ার টিলারের একগেয়ে বিরামহীন শব্দ।এলাকার গৃহস্থরা গণি মিয়ার পাওয়ার টিলার ভাড়া নিয়ে জমি চাষ করেন।অন্যদের মতো মছব্বির চৌধুরীও নিজের জমি চাষ করার জন্য গনি মিয়ার পাওয়ার টিলা ভাড়া নেন।গণি মিয়া লোকটা খাড়াপ না ।যথেষ্ট অমায়িক বাপের মতো মান্য চিহ্ন আছে তার স্বভাবে।তার এরূপ স্বভাবের জন্য জন্য মছব্বির চৌধুরী গণি মিয়াকে পছন্দ করেন।
কী যেনো ভাবছিলেন ।স্মরণ করতে চেষ্ট করলেন মছব্বির চৌধুরী ।হাঁ গাড়ী ! তাঁরও এমন একটি গাড়ী থাকতে পারতো।
বৃটিশদের জমিদারী উচ্ছেদ আইনের কারণে আজ তাঁদের মতো অভিজাতদের পতন হয়েছে।তাঁর বাবার আমল হতে আর্থিক সংস্থানের বিষয়াদি কমতে শুরু করে।অর্থাভাবে তাঁদের বিলাসিতাকে ক্রমশ সংকোচিত করে ফেলেছিল।কিন্তু তা বলা বা প্রকাশ করা যেতো না আভিজাত্যের কারণে।বলতে না পারা এ আরেক অন্য ধরণের কষ্ট।তবু বাবা আভিজাত্য ছাড়েননি।আকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন মনে প্রাণে।তিনিও বাবার তথা পারিবারিক ঐতিয্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন ।কাউকে বুঝতে দেননি অভাব অনাটনের কথা।বাবার মুখে শুনেছেন কোন এক জমিদার বংশের ব্যক্তি জমা জমি বিক্রী করে নি:শ্ব হয়ে গিয়েছিলেন।তিনি জীবন ধারণের জন্য তাঁর সাবেক প্রজাদের যারা জমিদারী উচ্ছেদ আইনের কারণে সচ্ছল হয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে ঘোড়ায় চরে ভিক্ষা করতেন।এমনি ছিল জমিদারী বংশের জ্ঞাতাভিমান।
 লোকে বলে জমিদাররা অত্যাচারী ছিল।অত্যাচারিত মানুষের অভিশাপে জমিদারদের পতন হয়েছে।কিন্তু লোকে এটা জানে না ইংরেজদের খাজনা তোলার জন্যই জমিদারদের অত্যাচারী হতে হতো।না হলে জমিদারী লাটে উঠবে যে।জনগণ অত্যাচারিত হলো ।লাভ হলো ইংরেজদের ।বৃটিশরা  আজও  ধনী ।দেশের মানুষ গরীব হলো ,নি:শ্ব হলো।দোষ হলো দেশীয় জমিদারদের ।কিন্তু ইংরেজরা কেন দোষী হলো না।কারণ ইংরেজরা ছিল পরদেশী।এদেশ ছিল তাদের লাভের স্থান,ব্যবসা করে ধনী হবার উপলক্ষ।জমিদার শ্রেণী ইংরেজরাই তৈরী করে তাঁদের সুবিধার জন্য।দেশের ধনী জমিদাররা ইংরেজদের সহযোগী হিসাবে অত্যাচারী হয়ে উঠে!তাই ইংরেজদের যেনো কোন দোষ না থাকে সেজন্য আইন করে উচ্ছেদ করে যায় তাঁদেরই তৈরী করা জমিদারদের।আজো সেই ইংরেজ পদ্ধতির শাসনের আইনের পথেই দেশ চলছে ।তাহলে জমিদারদের কি দোষ ছিল ?ইংরেজদের সেই চাপিয়ে দেয়া আইনে আজকের দেশে শান্তি সমৃদ্ধি হবে কি করে ?তিনি ভেবে পান না।এক পর্যায়ে ভাবনার হাল ছেড়ে দেন।
এই বিষয়ে সন্দেহের দানা ক্রমশ গড়াগড়ি দেয় মছব্বির চৌধুরীর মনে।মনে পড়ে যায় এক বাংলাদেশীয় বৃটিশ এমবাসেডর বলেছিলেন,
“-বৃটিশদের ডাষ্ট বিনে ফেলে দেয়া আইনে চলছে বাংলাদেশ ।”
বাংলাদেশে জমিদারদের সৃষ্টি করে ধ্বংশ করেছে বৃটিশরা আবার নিজ দেশে রাজতন্ত্র।জমিদারী আর রাজতন্দ্র কি সমার্থক নয় ?বৃটিশরা রানীর শাসন ও রাণীকে শ্রদ্ধা করে সেই আদ্যিকাল হতে ।এই পর্যায়ে এসে মছব্বির চৌধুরী চিন্তা খেই হাড়িয়ে ফেলেন।উনি উপলদ্ধি করলেন যে,আজকাল তাঁর সবকিছু মনে থাকে না।আগেরটা পরে :পরেরটা আগে চলে আসে ।উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত তথ্য মনে করতে পারেন না ।সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়।কোথায় গাড়ী নিয়ে ভাবছিলেন ।তা নয়,এক লহমায় মনের ভাবনা কোথা থেকে কোথায় চলে যায় !এ কথা ভেবে তিনি দিশা পান না।আজকাল মনটা অদ্ভুদ খেয়ালী আচরণ করছে ।বয়স বাড়ছে।বয়স বাড়লে সবারই কি এমন হয়।নাকি শুধু উনারই এমন হচ্ছে ।ভেবে কূল কিনারা পান না তিনি।যেমন শৈশবে বাড়ীর পাশে নদীটির কথা ভেবে কূল কিনারা পেতেন না তিনি।
নদীটি আসলো কোথা থেকে
  কোথায় চলে যায়
 কচুরীপানা ভেসে ভেসে কোথায় চলে যায়?
নদীর শেষ কোথায়?
বাবা ইয়াছির চৌধুরীকে প্রশ্ন করে জানতে পেরেছিলেন নদী সাগরে গিয়ে শেষ হয় ।
-সাগর কতো দূরে বাবা ?
 -সাগর অনেক অনেক দূরে ।সাগর অনেক বড় বাছা।বড় হলে জানতে পারবে!
স্নেহের পূত্রের ব্যাকুল প্রশ্নমালার উত্তরে বলতেন বাবা ইয়াছির চৌধুরী ।ইয়াছির চৌধুরী বেঁচে ছিলেন ৯৮ বছর ।মৃত্যুর শেষ সময় পর্যন্ত হাঁটতে পারতেন লাঠিতে ভর দিয়ে চোখেও ভাল দেখতে পারতেন ।বা অনেক গল্প করতেন ।বাবা নদীর কথা বলতেন।গল্পগুলো ছিল বেশীর ভাগ মাছ বিষয়ক ।যেমন নদীর মাছ গুলো বিশাল ছিল ।আর খেতে খুব সুস্বাদু ছিল।জেলেরা  প্রচুর মাছ ধরতো,বড় মাছ গুলো নিয়ে আসতো জমিদার বাড়ীতে বেশী দাম পাবে বলে।তাঁর বাবা শরফুদ্দীন চৌধুরীর নির্দেশও ছিলো সেরকমই।শরফুদ্দীন চৌধুরীকে ভীষন ভয় ও সমীহ করতো এলাকার মানুষ। দাদা শরফুদ্দীন চৌধুরীকে ভীষণ ভয় পেতেন মছব্বির চৌধুরীও।যেনো রূপকথার আজব কোনো বুড়ো  কুজোঁ হয়ে লাটিতে ভর দিয়ে জীবন্ত চলা ফেরা করছেন।মোটা উত্তল লেন্সের চশমা পড়তেন তিনি।চশমার ভিতর চোখ গুলো দেখা যেতো বড়ো বড়ো দৈত্যের চোখের মতো।তাই দেখে ভয় পেতেন মছব্বির চৌধুরী ।আর লাঠি আর কুজোঁ হয়ে চলার অবয়ব আরো ভীতির কারণ হতো মছব্বির চৌধুরী কাছে।গরমের দিন পুকুরে নেমে ই্ছে মতো ঘন্টার পর ঘন্টা দাপাদাপি করতেন।এজন্য জ্বরে পরে ভূগতেও হতো কিছুদিন। কারো কথা শুনতেন না তিনি ।কিন্তু দাদা এসে একটু ধমক দিলে ভয়ে উঠে পরতেন,কোন টু শব্দ না করে।কারণ দাদাকে তিনি ভীষণ ভয় পেতেন।আর দাদীকে ভীষণ ভালবাসতেন মজার মজার গল্প বলার জন্য।
বাবা ইয়াছির চৌধুরী নদী ও মাছের গল্প শুনে তিনি ভাবতেন,বড় হয়ে বাবাকে অনেক বড় বড় মাছ খাওয়াবেন ।স্কুল মাষ্টারীর চাকুরীর প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বড় একটি রুই মাছ আনিয়েছিলেন বিল থেকে।একদম তাঁজা মাছ।আর নিয়েছিলেন মিষ্টি ।কারণ বাবা মাছ মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন।মায়ের হাতের রান্নায় মাছটির স্বা হয়েছিল অমৃত ।মায়ের হাতের অসাধারণ রান্নর স্বাদ  আজো মনে হয় তাঁর ।কিন্তু সেদিন বাবা খাবার পর বলেছিলেন মাছটি খেতে সুস্বাধু হলেও ;সেই ছেলেবেলার নদীর মাছের মতো সুস্বাদু নয়।তা শুনে মছব্বির চৌধুরী ভাবতেন বাবার ছেলেবেলার খাওয়া মাছ নিশ্চই অতিশয় সুস্বাদু ছিল।
মাছদের মধ্যে ইলিশ মাছ মছব্বির চৌধুরীর অতি প্রিয় একটি মাছ।ছেলেবেলায় যে ইলিশ মাছ খেয়েছেন তার স্বাধ ও গন্ধ এখনো মনে পরে।এখনকার ইলিশে সেই স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যায় না।যদিও রকিবের আম্মার রান্নার হাত ভালো।কারণ এখন মাছে দেয়া হয় ফর্মালিন ! স্বাদ কোথায় থাকবে ?
ছেলে রকিব চৌধুরী ।লন্ডন প্রবাসী।ইন্টার মিডিয়েট পাশের পর বিয়ে দিয়েছিলেন লন্ডনী ফ্যামিলীতে।বিয়েতে তিনি রাজী ছিলেন না।তাঁর ইচ্ছা ছিল, ছেলে পড়া লেখা করে ম্যাজিষ্ট্রেট, জেলা কালেক্টর হবেন ।জেলা কালেক্টরের অনেক ক্ষমতা।আরেকটি  কারণ মেয়ের পরিবারের পূর্ব পূরুষ একদা লন্ডনী ভাউচারে  গিয়ে ধনী হবার আগে মাটির জিনিস পত্র কলসি,মটকা সানকি ইত্যাদি নৌকায় ভরে গ্রামে গঞ্জে ফেরী করে বিক্রী করে জীবিকা নির্বাহ করতো ।কিন্তু মেয়ের ছেলে দেখে পছন্দ হয়েছে ।এজন্য ঘটকও পাঠিয়েছেন ।মেয়ের পক্ষ হতে ঘটকালী ।কি কলিকাল ।মেয়ে পক্ষের বাবা মা এসে বুঝালেন,মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্য আত্মীয় স্বজনের পক্ষ হতে বিস্তর চাপ আসছে।তাঁদের ছেলে কোন অংশে কম?সকলে লন্ডনী মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যত জীবন দেখতে চায়।কিন্তু মেয়ের কাউকে পছন্দ নয়্ বিয়ে করতে রাজী নয়।জর করে বিয়ে দিলে,লন্ডনে গিয়ে ডিভোর্স হয়ে যেতে পারে ।এতে মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে ।বাপ মা হিসাবে তারা এমনোক তারা তা কখনো চান না।মেয়ের পছন্দ তাঁর ছেলেকে্।আলাপ চারিতায় জানতে পারলেন এঁরা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন।স্ত্রীও সায় দিলেন।অগত্যা রাজী হতে হলো মছব্বির চৌধুরীকে ।
সেই ছেলে ইংরেজ দেশে গিয়ে সংসারের খরচের টাকা পাঠাচ্ছেন।তার ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছে।যে ইংরেজদের জন্য তাঁর বংশের উত্থান পতন!বড়ই অদ্ভুদ এই দুনিয়া!ভাবলেন মছব্বির চৌধুরী ।
মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।সরকারী দলের দুগ্রুপ ছাত্রের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।একজন ছাত্র মারা গেছে । বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনিদৃষ্ট কালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ্ ঘোষনা করেছেন ।তিনি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকেন,কখন কি হয়ে যায় !সায়মা সবসময় বাবাকে চিন্তা না করার জন্য বলে।কিন্তু সন্তানের জন্য বাবা মায়ের চিন্তার কি শেষ হয় !মেয়ে আসছে বাড়ীতে।আদরের মেয়ের জন্য ভাল মন্দ খাওয়ার ব্যবস্থার  জন্য তিনি বাজারে যাচ্ছেন।রকিবকে ম্যাজিষ্ট্রেট করতে পারেন নি।সায়মা এখন একমাত্র ভরসা।সায়মা চৌধুরী লেখাপড়ায় খুব মেধাবী।সে ম্যাজিষ্টে হতে পারবে এ ব্যাপারে মছব্বির চৌধুরী নিশ্চিত । কিন্তু তিনি আজকাল শুনতে পান বি সি এস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় ।চাকুরী পেতে হলে মন্ত্রী এমপির সুপারিশ লাগে।এই ভাবনায় এসে তাঁর মনে খটকা লাগে।এমন খটকার জটিলতা  থেকে তাঁর মন বের হতে পারে না।তিনি হতাশ হন।

শিশু মছব্বির চৌধুরীর এর কাছে কামলা আব্দুল ভাই ছিল পছন্দের লোক ।আব্দুল ভাইকে একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-‘দাদা এমন কুঁজো হয়ে চলেন কেন ?’
আব্দুল উত্তরে বললেন, -‘তিনার বাতাশ লাগছে।’
-‘কি বাতাশ ?’
-‘দেঁওয়ের বাতাশ।হেই বাতাশ লাগার কারনে তিনি কুঁজো হয়ে গেছেন।’
বলেছিলেন আব্দুল।
-‘দেঁও কি ?’
-‘দেঁও খুব খাড়াপ ,গাঁয়ে খুব শক্তি দেঁওয়ের ।মানুষকে কাতুকুতু দেয় ,এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।’
বলেছিলেন কামলা আব্দুল ভাই।
সেদিন আব্দুল ভাইয়ের কথা শুনে দাদার ব্যাপারে ভয়ের মাত্রাটা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
যখন তিনি আরেকটু বড় হয়ে কিশোর বয়সে উপনীত হলেন তখন থেকে দাদাকে আর ভয় লাগতো না। বরং দাদা হয়ে উঠেছিলেন  একজন পূরানো দিনের গল্পবলা প্রিয় বুড়ো । বন্ধু জন।সে সময় দাদা আপন হয়ে গেলেন আর বাবাকে ভয় পেতে থাকলেন।বাবা পড়াশুনার খবর নিতেন,উপদেশ দিতেন,যদিও বাবার উপদেশগুলো ভাল লাগতো না ,চলা ফেরায় কোন ব্যত্যয় ঘটলে বাবা কৈফিয়ত চাইতেন।অনেক সময় তাঁর কৈফিয়তের সদোত্তর দেয় সম্ভব হতো না।মনে হতো বাবা তার স্বাধীন ভাবে চলাফেরায় অযথা হস্তক্ষেপ করছেন।কিন্তু বাবার উপদেশগুলো ফেলে দেয়া যেতো না।এ কারণে বাবাকে ভয় পেতেন ।পরে যখন মাষ্টারীর চাকরী পেয়ে  নিজের পায়ে দাড়িয়ে যান ,তখন বাবা প্রিয়জন হয়ে যান,উনাকে ভয় পাবার কিছু থাকে না।কেন বাবা শাসন করতেন বা তিনি বাবাকে বয় পেতেন সেগুলোর উত্তর পেয়ে যান তখন।দাদা বলেছিলেন তাঁর কোমড়ে বাতের ব্যাঁথার সমস্যার কারণে কুঁজো হয়ে চলতে হয়।
কিন্তু তিনি আজও আব্দুল ভাইয়ের বলা বাতাস লাগা বিষয়টি মিমাংসা করতে পারেননি।
কারণ গ্রামের কিছু মানুষের কাছে আজো বাতাস লাগা বিষয়টি বিশ্বাসের স্থান দখল করে আছে।এ রহস্য হয়তো ভেদ করা যাবে না।

 জমিদারদের বিশ্বাস ছিল তাঁদের জমিদারী বংশপরস্পরায় চলতে থাকবে।
এক কালে তাঁর পূর্ব পূরুষেরা প্রতাবশালী জমিদার ছিলেন।সম্পদের কোন অভাব ছিল না।যদি বৃটিশরা আইন করে জমিদারী উচ্ছেদ না করতো তাহলে তিনিও হয়তো আজ উত্তরাধিকারী সূত্রে বিরাট ধনী হতেন।এমন একটি গাড়ী তিনি কিনতে পারতেন অনায়াশে।ভাবলেন মুছব্বির চৌধুরী।গণি মিয়ার  কি গাড়ী কিনার সামর্থ্য আছে?থাকতেও পারে । কিন্তু গণি মিয়া গাড়ী কিনবে না ।সে খুব পরশ্রমী লোক।তার আরো টাকার প্রয়োজন,বিলাসিতা করার মানষিকতা গণি মিয়ার নেই।তিনি কল্পনা করে দেখলেন গণি মিয়া গাড়ী করে এসে আদাবের সাথে বলছে,
-সালামালাইকুম,চৌধূরী সাব !হেঁটে যাচ্ছেন যে!আসেন আমার গাড়ীতে উঠেন,আপনাকে পৌঁছে দেই।
নাহ্ !গণি মিয়াকে গাড়ীতে মোটেই মানাচ্ছে না।ভাবলেন তিনি।
কিন্তু এমন একটি গাড়ী কিনার টাকা তাঁর কাছে নেই।
একজন অবসর প্রাপ্ত প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকের অতো টাকা থাকবে কি করে !
লটারীতে টাকা পেলে হয়তো একটি গাড়ী কিনা যেতো।
গাড়ী কিনলে আবার চালানোর জন্য ড্রাইভার প্রয়োজন।
দিতে হবে মাসোহাড়া বেতন !তেল মবিল আরো কতো কি
একটু আগের চলে যাওয়া গাড়ীটার মালিক নিশ্চই ধনী লোক।ধনী লোকেরা গাড়ী কিনে শুধু আরাম আয়েশ বিলাসিতার জন্য?তা হয়তো নয় ।
ব্যবসায়ী মাত্র ধনী লোক ।ধনী লোকেদের ব্যবসার জন্য এখানে সেখানে যেতে হয় এজন্য সময় বাঁচানোর গাড়ী প্রয়োজন।আর বড় চাকুরীর কর্মকর্তাদের গাড়ী প্রয়োজন ।মূল্যবান সময় বাঁচানোর জন্য।
কিন্তু তাঁর কি গাড়ীর প্রয়োজন আছে? ভাবলেন মুছাব্বির চৌধুরী ।
কোথায় যেনো পড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কোন এক চাকুরে বেশ কিছু কিলোমিটার পায়ে হেঁটে প্রতিদিন অফিস করতেন ।যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে পায়ে হেঁটে অফিস করা বিষয়টি একটি অবাক করা ঘটনা।ভদ্রলোকের গাড়ী কিনার টাকা ছিল  না।আরেক ভারতীয় স্কুল মাষ্টার কয়েক কিলোমিটার সাঁতরিয়ে ছাত্রদের পড়াতে আসতেন স্কুলে।নাহ্! সে তোলনায় তিনি ভালই আছেনে!
এদিকে রিক্সা তেমন একটা চলে না ।তাই আজকের গরমে একটু কষ্ট বেশী হচ্ছে মুছব্বির চৌধুরীর ।তাছাড়া ডায়বেটিশ হার্টের সমস্যা আছে মছব্বির চৌধুরীর ।তাই হাঁটা প্রয়োজন।শরীরটা হলো বাইসাইকেলের মতো ।সব সময় তেল মবিল দিয়ে চালু রাথতে হয় ।ফেলে রাখলে জং ধরে অকেজো হয়ে পরতে পারে।ভাবলেন তিনি।ভারতীয় স্কুল মাষ্টার অথবা যুক্তরাষ্ট্রের ভদ্রলোকের  কথা ভেবে তিনি শান্তনা পেলেন।কারণ তাঁরা কখনো বলেননি তাঁদের কষ্ট হচ্ছে বরং তাঁরা যেনো এরূপ জীবন উপভোগ করছেন।
আসলে তাঁর গাড়ীর প্রয়োজন নেই বলেই গাড়ী নেই ।
এমন যুক্তির কথা ভেবে তাঁর বিষন্ন মনটা খুশী হয়ে উঠলো ।
ঘটনাটা ঘটলো ঠিক সে সময়!
পিছন থেকে গণি মিয়ার ট্রাক্টরের ষ্টিল বডির কোনা মছব্বির চৌধুরীর মেরুদন্ডে সজোরে আঘাত করলো। তিনি পিঠে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে ছিটকে পড়লেন কার্লভার্টের কার্নিশে।ভীষণ জোরে মাথা ঠুকে গেল কার্লভার্টের কার্নিশে।তারপর হাত পা ছড়িয়ে পরলেন স্বল্প পানির নিচের খালটিতে ।ঘটনার আকশ্মিকতায় গণি মিয়া হতভম্ব হয়ে গেলেন ।কয়েকদিন যাবত ট্রাক্টরটিতে ব্রেক কাজ করছিল না ব্রেক সারাতেই বাজারে নিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাক্টরটিকে।চারিদিকে একটা হৈই চৈই রব শুনা গেল ।মছব্বির চৌধুরী চিত হয়ে নি:সাড় দেহে হাত পা ছড়িয়ে পরে রয়েছেন অল্প পানির খালে ।তিনি হৈই চৈই শুনতে পাচ্ছিলেন ।শুরুতে তীব্র ব্যথার অনুভূতি পেলেও এখন তিনি ব্যাথার অনুভূতি পাচ্ছিলেন না বরং শরীরটা হালকা হালকা আরাম দায়ক লাগছিল।নীল আকাশে একটি চীলকে বৃত্তাকারে উড়তে দেখতে পাচ্ছিলেন।চিলটি যেনো অনন্তকাল ধরে উড়ছে। দেখতে ভাল লাগছিল।হঠা করে তিনি উপলদ্ধি করলেনদুনিয়া কিছুই নাস্ত্রী সন্তান আত্মীয় স্বজন সমস্তই দুনিয়ার মায়া।তিনি এখন সে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত!গাড়ীর যেমন প্রয়োজন নেই বলে ছিল না ,বলে মনটা খুশী হয়েছিল।তেমনি এখন পৃথিবীর কোন কিছুই প্রয়োজন নেই মানে করে ভাল লাগার অনুভূতি হল।তিনি অপার এক ভাল লাগার ঘোরে আচ্ছন্ন হলেন।পৃথিবীর যাবতীয় প্রয়োজনহীনতা তাঁকে অজানা এক প্রচন্ড সুখ বোধে আচ্ছন্ন করলো ।তিনি আকাশের উড়ন্ত চিলটিকে একই ভাবে বার বার উড়তে দেখতে পেলেন।
মছব্বির চৌধুরী এলাকার মানী লোক,  সবাই ধরাধরি করে গণি মিয়ার ট্রাক্টরে তোলে হাসপাতালে নিয়ে আসলেন।ডাক্তার আসলেন।এখন মছব্বির চৌধুরীর চোখে উড়ন্ত চিলের বদলে হাসপাতালের সাদা ছাদ ।সেখানে দু একটি মাকড়সার জাল দেখতে পেলেন।শিকার ধরার জন্য ,বেচেঁ থাকার জন্য কী প্রানন্ত প্রচেষ্টা মাকড়সাদের!আগে কখনো এভাবে দেখতে পাননি কেন ? তাদের কথা এভাবে ভাবতে পারেননি কেন ?তিনি কি অন্য জগতে চলে এসেছেন।যেখানে চিন্তা ভাবনা অন্য রকম ?
তিনি শুনতে পেলেন ডাক্তার যেনো অনেক দূর থেকে বলছেন 
“–ইনি এক্সিডেন্টের সংগে সংগেই মারা গেছেন।?”
উপস্থিত জনেরা ইন্না লিল্লাহ পড়লেন ।
একজন এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে মছব্বির চৌধুরীর খোলা চোখ দুটোর চোখের পাতা ঢেকে দিলেন। মছব্বির চৌধুরী অন্দকার দেখলেনঅন্ধকারের পর্দায় সাড়া জীবনের ঘটনাগুলো ছায়াছবির মতো ভেসে উঠলো ।দাদা দাদী বাবা মা স্ত্রী সন্তান স্কুলের ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন লোকজন।তিনি অবাক আনন্দিত হলেন এই ভেবে তাঁর জীবনে কতো ঘটনাই না ঘটেছে,যেগুলো তিনি জানতেন না,তিনি ফেলে যাওয়া জীবনের ছায়াছবিতে মগ্ন হলেন।ক্রমশ লোকজনের কথাবার্তার ধ্বনী ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে লাগলো
 কে যেন একজন বললেন “ লোকটা অনেক ভালো ছিলেন!”
এক সময় তিনি চীরদিনের জন্য প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে গেলেন।