Showing posts with label Bengali Language বাংলা ভাষা. Show all posts
Showing posts with label Bengali Language বাংলা ভাষা. Show all posts

Tuesday, June 20, 2017

বাংলা ভাষা চর্চায় শব্দের গ্রহণ-বর্জন



বাংলা ভাষা  চর্চায় শব্দের গ্রহণ-বর্জন

বাংলা ভাষার শব্দমালাতে তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশী বিদেশী এই পাঁচশ্রেণীর শব্দের সংযোজন ঘটেছে
 এই পাঁচশ্রেণীর শব্দই এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে
 শুধু বিদেশী শব্দগুলো ব্যতীত অন্য শব্দগুলো প্রাচীনকাল থেকেই ভূখণ্ডে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক অনুপাতে উল্লেখ করেছেন এভাবে-
 ১।তৎসম শব্দ শতকরা ২৫ ভাগ;
 ২।অর্ধতৎসম ভাগ;
 ৩। তদ্ভব ৬০ ভাগ;
৪। দেশী দুই ভাগ এবং
৫। বিদেশী আট ভাগ
বাংলা ভাষাতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজারের মতো শব্দ রয়েছে
১।তৎসম শব্দ
সংস্কৃত ভাষার যে-সব শব্দ পরিবর্তিত না হয়ে সরাসরি বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সে সব শব্দকেই বলা হয় তৎসমতৎসম শব্দ উদাহরণ- চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন, ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য ।
 তৎসম  বাংলা ভাষায় ব্যবহূত  সংস্কৃত শব্দতৎমানে তার অর্থাৎ সংস্কৃতের এবংসমমানে তুল্য অতএব যে শব্দগুলি কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই বাংলা ভাষায় ব্যবহূত হয় সেগুলিই তৎসম শব্দ অর্থেতৎসমশব্দের প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় দন্ডীর (আনু. ৮ম শতকের প্রথমভাগ) কাব্যাদর্শে তিনি  প্রাকৃত ভাষার উল্লেখ প্রসঙ্গে যেব শব্দ সংস্কৃত প্রাকৃত উভয় ভাষায় একই রকম সেগুলিকে বলেছেন তৎসম বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার আছে
প্রাক্ আর্যযুগে বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষার কিছু কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে, যেগুলিকে বলা হয় দেশি শব্দ, যেমন: পেট, ডোঙ্গা, ঢিল, কুলা ইত্যাদি। আর বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের মাধ্যমে যে শব্দগুলি অনুপ্রবেশ করে সেগুলিই খাঁটি বাংলা শব্দ। সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোকেরা এগুলি ব্যবহার করত, কিন্তু দশম শতকের পূর্ব পর্যন্ত সাহিত্যে এগুলি ব্যবহূত হতো না। মধ্যযুগে ভাষায় এক বিশাল সাহিত্য সৃষ্ট হলেও আধুনিক যুগের লেখকরা বাংলা ভাষার সীমিত শব্দসম্ভার নিয়ে কাব্যচর্চায় সাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। তাঁরা সংস্কৃত থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ নিয়ে বাংলায় কাব্যচর্চা করেন। কারণ, প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃত ছিল এদেশের ধর্মদর্শন সাহিত্যের বাহন এবং ভাষার শব্দগুলি গুরুগম্ভীর ভাব প্রকাশের উপযোগী।
উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে যখন বাংলা পড়ানো শুরু হয়, তখন সংস্কৃত পন্ডিতদের দ্বারা উপযুক্ত পাঠ্য পুস্তক লেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর ফলে প্রচুর তৎসম শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে এবং ক্রমশই এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাধু বাংলায় তৎসম শব্দের সংখ্যা ৭০ ভাগেরও বেশি এবং চলিত বাংলায় শতকরা ৪০-৪৫টি। একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের রচনার শতকরা ২৫টি শব্দই তৎসম। যাঁদের রচনার মাধ্যমে তৎসম শব্দ ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করে তাঁরা হলেন  রামরাম বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরমৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র  চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার-প্রক্রিয়াকে কেউ কেউসংস্কৃতায়নবলে অভিহিত করেন।
বাংলা ভাষায় ব্যবহূত তৎসম শব্দগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায়: সমোচ্চারিত অসমোচ্চারিত। প্রথম শ্রেণির শব্দগুলি হুবহু সংস্কৃতের মতো লিখিত উচ্চারিত হয়, যেমন: নারী, নদী, ভ্রাতা, বধূ ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় শ্রেণির শব্দগুলি সংস্কৃত অনুযায়ী লিখিত হলেও উচ্চারণে কিছুটা পার্থক্য ঘটে, যেমন: বৃক্ষ, পদ্ম, ভস্ম ইত্যাদি। এছাড়া আরও কিছু সংস্কৃত শব্দ সামান্য বিকৃতভাবে বাংলায় ব্যবহূত হয়, যেগুলিকে বলা হয় অর্ধতৎসম শব্দ, যেমন: চন্দর< চন্দ্র, বাদ্যি < বাদ্য, মিষ্টি <মিষ্ট, সত্যি < সত্য ইত্যাদি।  [দুলাল ভৌমিক]

. অর্ধ-তৎসম শব্দ:
যে -সব সংস্কৃত শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় অর্ধ-তৎসম। যেমন, জ্যোৎস্না˂ জ্যোছনা, শ্রাদ্ধ˂ ছেরাদ্দ, গৃহিণী˂ গিন্নী, বৈষ্ণব˂ বোষ্টম, কুৎসিত˂ কুচ্ছিত
. তদ্ভব শব্দ
বাংলা ভাষা গঠনের সময় প্রাকৃত বা অপভ্রংশ থেকে যে সব শব্দ পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছিলো, সেগুলোকেই বলা হয় তদ্ভব শব্দ। অবশ্য, তদ্ভব শব্দের মূল অবশ্যই সংস্কৃত ভাষায় থাকতে হবে। যেমন- সংস্কৃতহস্তশব্দটি প্রাকৃততেহত্থহিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর বাংলায় এসে সেটা আরো সহজ হতে গিয়ে হয়ে গেছেহাত তেমনি, চর্মকার˂ চম্মআর˂ চামার,
.দেশি শব্দ
বাংলা ভাষাভাষীদের ভূখণ্ডে অনেক আদিকাল থেকে যারা বাস করতো, সেইসব আদিবাসীদের ভাষার যে সব শব্দ বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সে সব শব্দকে বলা হয় দেশি শব্দ। এই আদিবাসীদের মধ্যে আছে- কোল, মুণ্ডা, ভীম, ইত্যাদি। মেমন, কুড়ি (বিশ)- কোলভাষা, পেট (উদর)- তামিল ভাষা, চুলা (উনুন)- মুণ্ডারী ভাষা
. বিদেশি শব্দ
বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের ভাষা থেকে যে সব শব্দ গ্রহণ করেছে, বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে অন্য ভাষার শব্দ গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় বিদেশি শব্দ। যে কোনো ভাষার সমৃদ্ধির জন্য বিদেশি শব্দের আত্মীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এদিক দিয়ে বাংলা ভাষা বেশ উদারও বটে
  • আরবি শব্দ : আল্লাহ, ইসলাম, ঈমান, ওযু, কোরবানি, কুরআন, কিয়ামত, গোসল,
জান্নাত, জাহান্নাম, হওবা, হসবি, যাকাত, হজ, হাদিস, হারাম, হালাল আদালত, আলেম, ইনসান, ঈদ, উকিল, ওজর, এজলাস, এলেম, কানুন, কলম, কিতাব, কেচ্ছা, খারিজ, গায়েব, দোয়াত, নগদ, বাকি, মহকুমা, মুন্সেফ, মোক্তার, রায
  • ফারসি শব্দ: খোদা, গুনাহ, দোযখ, নামায, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বেহেশত, রোযা
কারখানা, চশমা, জবানবন্দি, তারিখ, তোশক, দফতর, দরবার, দোকান,দস্তখত, দৌলত, নালিশ, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, মেথর, রসদ আদমি, আমদানি, জানোয়ার, জিন্দা, নমুনা, বদমাস, রফতানি, হাঙ্গামা
  • ইংরেজি শব্দ: প্রায় অপরিবর্তিত উচ্চারণে- চেয়ার, টেবিল, পেন, পেন্সিল, ইন্টারনেট, ইনপুট, আউটপুট, আপলোড, ডাউনলোড
পরিবর্তিত উচ্চারণে- আফিম (opium), ইস্কুল (school), বাক্স (box), হাসপাতাল (hospitai), বোতল (bottle), ডাক্তার (doctor), ইংরেজি (English) ইত্যাদি
  • পর্তুগিজ শব্দ : আনারস, আলপিন, আলমারি, গির্জা, গুদাম, চাবি, পাউরুটি, পাদ্রি, বালতি
  • ফরাসি শব্দ : কার্তুজ, কুপন , ডিপো, রেস্তোরাঁ
ওলন্দাজ শব্দ : ইস্কাপন, টেক্কা, তুরুপ, রুইতন, হরতন (তাসের নাম)
  • গুজরাটি শব্দ : খদ্দর, হরতাল
  • পাঞ্জাবি শব্দ : চাহিদা, শিখ
  • তুর্কি শব্দ : চাকর, চাকু, তোপ, দারোগা
  • চিনা শব্দ : চা, চিনি, লুচি
মায়ানমার/ বর্মি শব্দ : ফুঙ্গি, লুঙ্গি জাপানি শব্দ : রিক্সা, হারিকিরি
  • মিশ্র শব্দ:
এছাড়াও আরেকটি বিশেষ ধরনের শব্দ আছে। দুইটি ভিন্ন ধরনের শব্দ সমাসবদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে একত্রিত হলে নতুন শব্দটিকে বলা হয় মিশ্র শব্দ। এক্ষেত্রে যে দুইটি শব্দ মিলিত হলো, তাদের শ্রেণীবিভাগ চিনতে পারাটা খুব জরুরি। যেমন- রাজা-বাদশা (তৎসম+ফারসি) হাট-বাজার (বাংলা+ফারসি) হেড-মৌলভী (ইংরেজি+ফারসি) হেড-পন্ডিত (ইংরেজি+তৎসম) খ্রিস্টাব্দ (ইংরেজি+তৎসম) ডাক্তারখানা (ইংরেজি+ফারসি) পকেট-মার (ইংরেজি+বাংলা)

গঠন অনুসারে শ্রেণিবিভাগ
গঠন অনুসারে শব্দকে ভাগে ভাগ করা হয়: . মৌলিক শব্দ . সাধিত শব্দ
. মৌলিক শব্দ
যে -সব শব্দকে বিশ্লেষণ করলে আর কোন শব্দ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক শব্দ বলে। অর্থাৎ, যে সব শব্দকে ভাঙলে আর কোন অর্থসঙ্গতিপূর্ণ শব্দ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক শব্দ বলে। যেমন- গোলাপ, নাক, লাল, তিন, ইত্যাদি। এই শব্দগুলোকে আর ভাঙা যায় না, বা বিশ্লেষণ করা যায় না। আর যদি ভেঙে নতুন শব্দ পাওয়াও যায়, তার সঙ্গে শব্দটির কোন অর্থসঙ্গতি থাকে না। যেমন, উদাহরণের গোলাপ শব্দটি ভাঙলে গোল শব্দটি পাওয়া যায়। কিন্তু গোলাপ শব্দটি গোল শব্দ থেকে গঠিত হয়নি। এই দুটি শব্দের মাঝে কোন অর্থসঙ্গতিও নেই। তেমনি নাক ভেঙে না বানানো গেলেও নাক না থেকে আসেনি। অর্থাৎ, এই শব্দগুলোই মৌলিক শব্দ।গোলাপশব্দটির সঙ্গেপ্রত্যয় যোগ করে আমরাগোলাপীশব্দটি বানাতে পারি। তেমনিনাক’- সঙ্গেফুলশব্দটি যোগ করে আমরানাকফুলশব্দটি গঠন করতে পারি
. সাধিত শব্দ
যে সব শব্দকে বিশ্লেষণ করলে অর্থসঙ্গতিপূর্ণ ভিন্ন একটি শব্দ পাওয়া যায়, তাদেরকে সাধিত শব্দ বলে। মূলত, মৌলিক শব্দ থেকেই বিভিন্ন ব্যাকরণসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় সাধিত শব্দ গঠিত হয়। মৌলিক শব্দ সমাসবদ্ধ হয়ে কিংবা প্রত্যয় বা উপসর্গ যুক্ত হয়ে সাধিত শব্দ গঠিত হয়। যেমন- • সমাসবদ্ধ হয়ে- চাঁদের মত মুখ = চাঁদমুখপ্রত্যয় সাধিত- ডুব+উরি = ডুবুরিউপসর্গযোগে- প্র+শাসন = প্রশাসন
অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ
অর্থগত ভাবে শব্দসমূহকে ভাগে ভাগ করা যায়:
. যৌগিক শব্দ
যে-সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ একই, তাদের যৌগিক শব্দ বলে। অর্থাৎ, শব্দগঠনের প্রক্রিয়ায় যাদের অর্থ পরিবর্তিত হয় না, তাদেরকে যৌগিক শব্দ বলে।

 যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন (অর্থ) অর্থ গায়ক গৈ+অক যে গান করে কর্তব্য কৃ+তব্য যা করা উচিত বাবুয়ানা বাবু+আনা বাবুর ভাব মধুর মধু+ মধুর মত
মিষ্টি গুণযুক্ত দৌহিত্র দুহিতা+ষ্ণ্য (দুহিতা= মেয়ে, ষ্ণ্য= পুত্র) কন্যার মত, নাতি চিকামারা চিকা+মারা দেওয়ালের লিখন
. রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ
প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগে গঠিত যে সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ আলাদা হয়, তাদেরকে রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক/ মূল অর্থ হস্তী হস্ত+ইন হাত আছে যার একটি বিশেষ প্রাণী, হাতি গবেষণা গো+এষণা গরম্ন খোঁজা ব্যাপক অধ্যয়ন পর্যালোচনা বাঁশি বাঁশ+ইন বাঁশ দিয়ে তৈরি বাঁশের তৈরি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র তৈল তিল+ষ্ণ্য তিল থেকে তৈরি সেণহ পদার্থ উদ্ভিদ থেকে তৈরি যে কোন সেণহ পদার্থ প্রবীণ প্র+বীণা প্রকৃষ্টরূপে বীণা বাজায় যিনি অভিজ্ঞ বয়স্ক ব্যক্তি সন্দেশ সম+দেশ সংবাদ মিষ্টান্ন বিশেষ
. যোগরূঢ় শব্দ
সমাস নিষ্পন্ন যে সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ আর ব্যবহারিক অর্থ আলাদা হয়, তাদেরকে যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন ব্যবহারিক অর্থ পঙ্কজ পঙ্কে জন্মে যা পদ্মফুল রাজপুত রাজার পুত্র একটি জাতি বিশেষ, ভারতের একটি জাতি মহাযাত্রা মহাসমারোহে যাত্রা মৃত্যু জলধি জল ধারণ করে যা/ এমন সাগর
. নবসৃষ্ট বা পরিশব্দ বা পারিভাষিক শব্দ
বিভিন্ন বিদেশি শব্দের অনুকরণে ভাবানুবাদমূলক যেসব প্রতিশব্দ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলোকে নবসৃষ্ট বা পরিশব্দ বা পারিভাষিক শব্দ বলে। মূলত প্রচলিত বিদেশি শব্দেরই এরকম পারিভাষিক শব্দ তৈরি করা হয়েছে। যেমন- পারিভাষিক শব্দ মূল বিদেশি শব্দ পারিভাষিক শব্দ মূল বিদেশি শব্দ অম্লজান -Oxygen সচিব Secretary উদযান -Hudrogen স্নাতক -Graduate নথি -File স্নাতকোত্তর -Post Graduate প্রশিক্ষণ -Training সমাপ্তি -Final ব্যবস্থাপক -Manager সাময়িকী -Periodical বেতার -Radio সমীকরণ – Equation
এই বিভিন্ন রকম শব্দের মধ্যে ৫০ হাজার তৎসম; দুই হাজার ৫০০-এর মতো আরবি-ফারসি তুর্কি চার ’; ইংরেজি প্রায় দেড় হাজার; পর্তুগিজ-ফরাসি ১৫০ এবং অন্যান্য বিদেশী-দেশী তদ্ভব শব্দের প্রচলন দেখা যায় বাংলা ভাষাতে যে আট ভাগ বিদেশী শব্দ রয়েছে, সেসব শব্দের বাংলা কোনো প্রতিশব্দ নেই বলেই বাংলা ভাষা তা গ্রহণ করেছে ছাড়া বাংলা ভাষার শব্দগুলো দেশের মাটিতেই জন্মলাভ করেছে
দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া শব্দগুলো দিয়ে যখন মনের অভিব্যক্তি সঠিক এবং পরিস্কারভাবে বুঝানো কষ্টকর হয়ে ওঠে, তখন বাংলা ভাষা তার প্রয়োজনমাফিক সেই শব্দগুলোকে ভেঙে নতুন রূপে তৈরি করে নিয়েছে। যেমন- ‘হস্তগত, হস্তান্তরশব্দদুটি।হস্তএটি তৎসম শব্দ; আধুনিক বাংলা হাত। কোনো বস্তু বা জিনিস হাতে এসেছে এমন অর্থ বুঝাতে বলা হয় হস্তগত হয়েছে। আবার কোনো বস্তুর সত্ত্ব ত্যাগ করা অর্থে হস্তান্তর শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। হাত বলতে মানুষের একটি অঙ্গকে বোঝা যায়, কিন্তু হাত এর সাথেপ্রত্যয় যুক্ত করলে তখন আর অঙ্গ না বুঝিয়ে ভিন্ন একটি বস্তু বোঝায়। এভাবেই দেশে উৎপন্ন শব্দগুলো তার রূপ বদলিয়ে বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। বিদেশী শব্দগুলোও বাংলা ভাষার শব্দের ঘাটতি পূরণে সহায়তা যে করেনি তা নয়।
বিদেশী ভাষার শব্দগুলো বাংলা ভাষার ঘাটতি পূরণে সহায়তা করেছে তার মানে এই নয় যে, বিদেশী সব শব্দকেই অবলীলায় আলিঙ্গন করা যায়। একটি ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রাধান্য পেলে সে ভাষার টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ভাষার আগ্রাসন এখন পৃথিবীসুদ্ধ চলছে। বেশ কয়েকটি ভাষা বিভিন্নভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট ভাষার উপর সুকৌশলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার আগ্রাসন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার অগ্রাসনকেও কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলা ভাষার মানহানি হতে পারে বলে মনে করা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী যখন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক আগ্রাসন চালায়, তখন তাদের ভাষা কৃষ্টি কালচারকে সঙ্গে নিয়েই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। বাংলা ভাষার সুনাম রক্ষার্থে এই দিকটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়তে পারে এবং বিদেশী শব্দগুলোকে সতর্কতার সাথে গ্রহণ করার দাবি রাখে।
বাংলা ভাষাতে সংস্কৃতশব্দের কোনগুলোকে রাখা হবে আর কোন ধরনের শব্দগুলো বাদ দিতে হবে এবং বাংলা ভাষার সামগ্রীক রূপটি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায় তাঁরবাঙ্গালা ভাষানামক নিবন্ধে বলার চেষ্টা করেছেন। নিবন্ধটি ১৩৭ বছর পূর্বে ১২৮৫ বঙ্গাব্দেবঙ্গদর্শনপত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম সাহেব তাঁর নিবন্ধে সংস্কৃত ভাষার বাহুবল থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করে একটি সতন্ত্র রূপ দেয়ার কথা বলেছেন। চলিত ভাষাও যে সাহিত্যের ভাষা বা লেখ্য ভাষা হতে পারে তার প্রমাণ প্রথম মেলে প্যারীচঁাঁদ মিত্র ওরফে টেক চাঁদ ঠাকুর রচিতআলালের ঘরের দুলালগ্রন্থে। গ্রন্থটি চলিত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে। মানুষ যে ঢঙে কথা বলে, সেই চলিত ঢঙের বাংলাতেই গ্রন্থটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আলালের ঘরের দুলাল রচিত হওয়ার আগে বাংলা ভাষার লেখ্য কথ্য এই দুটি রূপ আলাদা আলাদাভাবে চলে আসছিল। লেখ্যরূপ হিসেবে সাধু ভাষা (সংস্কৃত ভাষার শব্দবহুল) এবং কথ্যরূপ হিসেবে চলিত ঢঙ (প্রায় সংস্কৃত শব্দলুপ্ত) ব্যবহার হতে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যে সাবলীল বাক্যে কথা বলেছে, লেখার সময় সেটিকে বাদ দিয়ে সাধু ভাষায় লেখা হয়েছে। অর্থাৎ বইপুস্তকের ভাষা এক এবং কথা বলার ভাষা আরেক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকে ফুলমণি করুণার বিবরণ, আলালের ঘরের দুলাল, হুতুমপেচা, মৃণালিনী ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তখন ভাবা হয়েছিল বাংলা ভাষা এভাবে চলতে থাকলে ক্রমান্বয়ে ভাষার আয়ু হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে জন্য বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ুকল্পেই রচিত হয়েছিল চলিত ভাষাসম্বলিত উল্লিখিত গ্রন্থাদি। এখন মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবেই লেখে এবং সে ভাষাতেই বইপুস্তক রচিত হয়। সেদিন সাধু-চলিত এর সঙ্কট থেকে বাংলা ভাষা অবমুক্ত হয়েছে, কিন্তু আজ বাংলা ভাষা আবার নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিদেশী ভাষার আগ্রাসন সেই সঙ্কটকে আরো গভির করে তুলতে পারে। এই সঙ্কট নিরসন করতে না পারলে ভাষার অস্তিত্বও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।
সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালু হবে এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভাষা অন্দোলনে রক্ত ঝরলেও বাংলা ভাষা সর্বস্তরে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় ইংরেজি হিন্দি ভাষা বাংলা ভাষার বুকে চেপে বসতে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি স্যাটেলাইট মিডিয়ার প্রভাবে হু হু করে বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। কোনোপ্রকার বিচার-বিবেচনা ছাড়াই সেসব শব্দ দেশের মানুষ কথায় কথায় বলছে এবং দলিল-দস্তাবেজ বইপুস্তকে ব্যবহার করছে। ধারা চলতে বাধা না পেলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত পথচলা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হতে পারে।
ভাব অর্থ ঠিকঠাকভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় যে (ভাব অর্থ প্রকাশে) যথোপযুক্ত কোনো শব্দ বাংলা ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে না, বিদেশী কোনো শব্দ হলে সে অর্থ পরিস্কার হয়ে উঠবে সে ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে ভাষার কোনো ক্ষতি না হয়ে ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে। ভাব অর্থের অনুকূল বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও সেসব শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা হলে বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ু স্বল্পদৈর্ঘ্য হতে পারে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, বহু মানুষ কথায় কথায় ইংরেজি হিন্দি শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। যেমনÑ ফল কিনতে যাচ্ছি ; না বলে বলা হচ্ছেফ্রুট কিনতে যাচ্ছি ঠিক আছে না বলে বলা হচ্ছেদ্যাট্স ওকে উপায় নেই না বলে বলা হচ্ছেনো ওয়ে দুঃখিত না বলে বলা হচ্ছেস্যরি জাদুকর না বলে বলা হচ্ছেম্যাজিশিয়ান লেখক না বলে বলা হচ্ছেরাইটার শিক্ষক না বলে বলছেটিচার চাচা-চাচী, খালা-খালু, মামা-মামী না বলে বলা হচ্ছে আঙ্কেল-আন্টি। খালাত ভাই, খালাত বোন; মামাত ভাই, মামাত বোন; ফুফাত ভাই, ফুফাত বোনকে বুঝাতেকাজিনবলা হচ্ছে।কাজিনবলতে কী খালাত বোনকে বোঝাবে না মামাত ভাইকে বুঝাবে? স্পষ্ট নয়, অথচ বাংলা ভাষায় এই সম্পর্কগুলোকে পরিস্কার করে বোঝানোর জন্য আলাদা আলাদা শব্দ থাকলেও বিদেশী শব্দকেকাজিনব্যবহার করা হচ্ছে। এই ছোট ছোট ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দগুলোই ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়ে বাংলা ভাষার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এভাবে বাংলা শব্দকে বাদ দিয়ে ইংরেজি শব্দের চর্চাতে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা নাও হতে পারে। কোনো বাক্যের অর্ধেকটা ইংরেজি আর অর্ধেকটা বাংলা বলা হলে সময়ের ব্যবধানে বাকি অর্ধেক বাংলা ব্যাক্যটাও ইংরেজি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটিই ভাষার আগ্রাসন। এভাবেই একটি ভাষাকে অন্য একটি ভাষা গ্রাস করে ফেলতে পারে। একটি ভাষার উপর আর একটি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। একজন মনুষ একাধিক ভাষা আয়ত্ব করতে পারে তাতে দোষের কিছু নেই বহুভাষির জন্য কথা বলার সময় বা লিখার সময় খেয়াল রাখা জরুরি যে, একটি ভাষাতেই বাক্যপূর্ণ করে কথা বলা হচ্ছে কি না। বাক্য পরিপূর্ণ করতে একসাথে একাধিক ভাষার শব্দ ব্যবহার না করাই সমীচীন। যদি লেখার সময় বা বলার সময় ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেই বাক্যটি ইংরেজি শব্দে ইংরেজি বর্ণেই পরিপূর্ণ করে তার অনুবাদ বাংলায় করে দিতে না পারলে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বাক্যটি বেমানান হয়ে ওঠে। কোনোভাবেই ছয় শব্দের একটি বাক্যের চারটি বাংলা শব্দ আর দুটি ইংরেজি শব্দ (যে শব্দের প্রতিশব্দ বাংলায় রয়েছে ) ব্যবহারে একটি বাক্য পূর্ণ করাকে প্রতিরোধ করতে না পারলে বাংলা ভাষার চর্চা রুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিদেশী ভাষার আগ্রসন প্রতিরোধে এবং বাংলা ভাষার চর্চা কল্পে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে ভাষাচর্চায় একটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। . প্রত্যেক উপজেলাতে একটি করে দফতর রাখা যেতে পারে, যেখানে এসে জনসাধারণ তাদের ব্যানার, পোস্টার, সাইনবোর্ড ইত্যাদির বানান, বাক্য, শব্দচয়ন ইত্যাদি ঠিক আছে কি না তা অনুমোদন করে নিয়ে সেটি টাঙানোর ব্যবস্থা করতে পারে। যেসব মানুষ তাদের ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার অনুমোদন করাবে না তাদের জরিমানার পর্যায়ে আনা যেতে পারে। . কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে চাইলে অবশ্যই সেই নাম বাংলা ভাষার বাংলা শব্দ বর্ণে লেখা যেতে পারে। ইংরেজি কোনো শব্দ বাংলা বর্ণে লেখার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে রাখতে চাইলে সে নাম ইংরেজি বর্ণমালায় বাংলা বর্ণের আকারের চেয়ে ছোট আকারের বর্ণে লেখা এবং তা বাংলা নামের নিচে স্থান করে দেয়ার চর্চা করতে হবে। . টেলিভিশন খবরে কাগজের খবরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপণগুলোর ভাষা শুদ্ধ বাংলায় হতে হবে বিদেশী শব্দ উপেক্ষা করার চেষ্টা থাকতে হবে। বাংলা একাডেমির দফতর থেকে প্রতিনিধির মাধ্যমে সারা দেশে ভাষা চর্চার বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কি না তা দেখভাল করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। . বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হলে এবং ভাষার স্থায়ীত্ব দীর্ঘায়িত করতে গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা জরুরি হতে পারে। এসব বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় না আনতে পারলে বাংলা ভাষার ব্যাপারে আশাহত হওয়া ব্যতীত আর অন্য উপায় কী হতে পারে!

 সূত্র –উকিপিডিয়া .বাংলাপিডিয়া,নয়া দিগন্ত
Showing posts with label Bengali Language বাংলা ভাষা. Show all posts
Showing posts with label Bengali Language বাংলা ভাষা. Show all posts

Tuesday, June 20, 2017

বাংলা ভাষা চর্চায় শব্দের গ্রহণ-বর্জন



বাংলা ভাষা  চর্চায় শব্দের গ্রহণ-বর্জন

বাংলা ভাষার শব্দমালাতে তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশী বিদেশী এই পাঁচশ্রেণীর শব্দের সংযোজন ঘটেছে
 এই পাঁচশ্রেণীর শব্দই এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে
 শুধু বিদেশী শব্দগুলো ব্যতীত অন্য শব্দগুলো প্রাচীনকাল থেকেই ভূখণ্ডে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক অনুপাতে উল্লেখ করেছেন এভাবে-
 ১।তৎসম শব্দ শতকরা ২৫ ভাগ;
 ২।অর্ধতৎসম ভাগ;
 ৩। তদ্ভব ৬০ ভাগ;
৪। দেশী দুই ভাগ এবং
৫। বিদেশী আট ভাগ
বাংলা ভাষাতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজারের মতো শব্দ রয়েছে
১।তৎসম শব্দ
সংস্কৃত ভাষার যে-সব শব্দ পরিবর্তিত না হয়ে সরাসরি বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সে সব শব্দকেই বলা হয় তৎসমতৎসম শব্দ উদাহরণ- চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন, ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য ।
 তৎসম  বাংলা ভাষায় ব্যবহূত  সংস্কৃত শব্দতৎমানে তার অর্থাৎ সংস্কৃতের এবংসমমানে তুল্য অতএব যে শব্দগুলি কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই বাংলা ভাষায় ব্যবহূত হয় সেগুলিই তৎসম শব্দ অর্থেতৎসমশব্দের প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় দন্ডীর (আনু. ৮ম শতকের প্রথমভাগ) কাব্যাদর্শে তিনি  প্রাকৃত ভাষার উল্লেখ প্রসঙ্গে যেব শব্দ সংস্কৃত প্রাকৃত উভয় ভাষায় একই রকম সেগুলিকে বলেছেন তৎসম বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার আছে
প্রাক্ আর্যযুগে বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষার কিছু কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে, যেগুলিকে বলা হয় দেশি শব্দ, যেমন: পেট, ডোঙ্গা, ঢিল, কুলা ইত্যাদি। আর বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের মাধ্যমে যে শব্দগুলি অনুপ্রবেশ করে সেগুলিই খাঁটি বাংলা শব্দ। সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোকেরা এগুলি ব্যবহার করত, কিন্তু দশম শতকের পূর্ব পর্যন্ত সাহিত্যে এগুলি ব্যবহূত হতো না। মধ্যযুগে ভাষায় এক বিশাল সাহিত্য সৃষ্ট হলেও আধুনিক যুগের লেখকরা বাংলা ভাষার সীমিত শব্দসম্ভার নিয়ে কাব্যচর্চায় সাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। তাঁরা সংস্কৃত থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ নিয়ে বাংলায় কাব্যচর্চা করেন। কারণ, প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃত ছিল এদেশের ধর্মদর্শন সাহিত্যের বাহন এবং ভাষার শব্দগুলি গুরুগম্ভীর ভাব প্রকাশের উপযোগী।
উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে যখন বাংলা পড়ানো শুরু হয়, তখন সংস্কৃত পন্ডিতদের দ্বারা উপযুক্ত পাঠ্য পুস্তক লেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর ফলে প্রচুর তৎসম শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে এবং ক্রমশই এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাধু বাংলায় তৎসম শব্দের সংখ্যা ৭০ ভাগেরও বেশি এবং চলিত বাংলায় শতকরা ৪০-৪৫টি। একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের রচনার শতকরা ২৫টি শব্দই তৎসম। যাঁদের রচনার মাধ্যমে তৎসম শব্দ ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করে তাঁরা হলেন  রামরাম বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরমৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র  চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার-প্রক্রিয়াকে কেউ কেউসংস্কৃতায়নবলে অভিহিত করেন।
বাংলা ভাষায় ব্যবহূত তৎসম শব্দগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায়: সমোচ্চারিত অসমোচ্চারিত। প্রথম শ্রেণির শব্দগুলি হুবহু সংস্কৃতের মতো লিখিত উচ্চারিত হয়, যেমন: নারী, নদী, ভ্রাতা, বধূ ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় শ্রেণির শব্দগুলি সংস্কৃত অনুযায়ী লিখিত হলেও উচ্চারণে কিছুটা পার্থক্য ঘটে, যেমন: বৃক্ষ, পদ্ম, ভস্ম ইত্যাদি। এছাড়া আরও কিছু সংস্কৃত শব্দ সামান্য বিকৃতভাবে বাংলায় ব্যবহূত হয়, যেগুলিকে বলা হয় অর্ধতৎসম শব্দ, যেমন: চন্দর< চন্দ্র, বাদ্যি < বাদ্য, মিষ্টি <মিষ্ট, সত্যি < সত্য ইত্যাদি।  [দুলাল ভৌমিক]

. অর্ধ-তৎসম শব্দ:
যে -সব সংস্কৃত শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় অর্ধ-তৎসম। যেমন, জ্যোৎস্না˂ জ্যোছনা, শ্রাদ্ধ˂ ছেরাদ্দ, গৃহিণী˂ গিন্নী, বৈষ্ণব˂ বোষ্টম, কুৎসিত˂ কুচ্ছিত
. তদ্ভব শব্দ
বাংলা ভাষা গঠনের সময় প্রাকৃত বা অপভ্রংশ থেকে যে সব শব্দ পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছিলো, সেগুলোকেই বলা হয় তদ্ভব শব্দ। অবশ্য, তদ্ভব শব্দের মূল অবশ্যই সংস্কৃত ভাষায় থাকতে হবে। যেমন- সংস্কৃতহস্তশব্দটি প্রাকৃততেহত্থহিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর বাংলায় এসে সেটা আরো সহজ হতে গিয়ে হয়ে গেছেহাত তেমনি, চর্মকার˂ চম্মআর˂ চামার,
.দেশি শব্দ
বাংলা ভাষাভাষীদের ভূখণ্ডে অনেক আদিকাল থেকে যারা বাস করতো, সেইসব আদিবাসীদের ভাষার যে সব শব্দ বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সে সব শব্দকে বলা হয় দেশি শব্দ। এই আদিবাসীদের মধ্যে আছে- কোল, মুণ্ডা, ভীম, ইত্যাদি। মেমন, কুড়ি (বিশ)- কোলভাষা, পেট (উদর)- তামিল ভাষা, চুলা (উনুন)- মুণ্ডারী ভাষা
. বিদেশি শব্দ
বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের ভাষা থেকে যে সব শব্দ গ্রহণ করেছে, বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে অন্য ভাষার শব্দ গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় বিদেশি শব্দ। যে কোনো ভাষার সমৃদ্ধির জন্য বিদেশি শব্দের আত্মীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এদিক দিয়ে বাংলা ভাষা বেশ উদারও বটে
  • আরবি শব্দ : আল্লাহ, ইসলাম, ঈমান, ওযু, কোরবানি, কুরআন, কিয়ামত, গোসল,
জান্নাত, জাহান্নাম, হওবা, হসবি, যাকাত, হজ, হাদিস, হারাম, হালাল আদালত, আলেম, ইনসান, ঈদ, উকিল, ওজর, এজলাস, এলেম, কানুন, কলম, কিতাব, কেচ্ছা, খারিজ, গায়েব, দোয়াত, নগদ, বাকি, মহকুমা, মুন্সেফ, মোক্তার, রায
  • ফারসি শব্দ: খোদা, গুনাহ, দোযখ, নামায, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বেহেশত, রোযা
কারখানা, চশমা, জবানবন্দি, তারিখ, তোশক, দফতর, দরবার, দোকান,দস্তখত, দৌলত, নালিশ, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, মেথর, রসদ আদমি, আমদানি, জানোয়ার, জিন্দা, নমুনা, বদমাস, রফতানি, হাঙ্গামা
  • ইংরেজি শব্দ: প্রায় অপরিবর্তিত উচ্চারণে- চেয়ার, টেবিল, পেন, পেন্সিল, ইন্টারনেট, ইনপুট, আউটপুট, আপলোড, ডাউনলোড
পরিবর্তিত উচ্চারণে- আফিম (opium), ইস্কুল (school), বাক্স (box), হাসপাতাল (hospitai), বোতল (bottle), ডাক্তার (doctor), ইংরেজি (English) ইত্যাদি
  • পর্তুগিজ শব্দ : আনারস, আলপিন, আলমারি, গির্জা, গুদাম, চাবি, পাউরুটি, পাদ্রি, বালতি
  • ফরাসি শব্দ : কার্তুজ, কুপন , ডিপো, রেস্তোরাঁ
ওলন্দাজ শব্দ : ইস্কাপন, টেক্কা, তুরুপ, রুইতন, হরতন (তাসের নাম)
  • গুজরাটি শব্দ : খদ্দর, হরতাল
  • পাঞ্জাবি শব্দ : চাহিদা, শিখ
  • তুর্কি শব্দ : চাকর, চাকু, তোপ, দারোগা
  • চিনা শব্দ : চা, চিনি, লুচি
মায়ানমার/ বর্মি শব্দ : ফুঙ্গি, লুঙ্গি জাপানি শব্দ : রিক্সা, হারিকিরি
  • মিশ্র শব্দ:
এছাড়াও আরেকটি বিশেষ ধরনের শব্দ আছে। দুইটি ভিন্ন ধরনের শব্দ সমাসবদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে একত্রিত হলে নতুন শব্দটিকে বলা হয় মিশ্র শব্দ। এক্ষেত্রে যে দুইটি শব্দ মিলিত হলো, তাদের শ্রেণীবিভাগ চিনতে পারাটা খুব জরুরি। যেমন- রাজা-বাদশা (তৎসম+ফারসি) হাট-বাজার (বাংলা+ফারসি) হেড-মৌলভী (ইংরেজি+ফারসি) হেড-পন্ডিত (ইংরেজি+তৎসম) খ্রিস্টাব্দ (ইংরেজি+তৎসম) ডাক্তারখানা (ইংরেজি+ফারসি) পকেট-মার (ইংরেজি+বাংলা)

গঠন অনুসারে শ্রেণিবিভাগ
গঠন অনুসারে শব্দকে ভাগে ভাগ করা হয়: . মৌলিক শব্দ . সাধিত শব্দ
. মৌলিক শব্দ
যে -সব শব্দকে বিশ্লেষণ করলে আর কোন শব্দ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক শব্দ বলে। অর্থাৎ, যে সব শব্দকে ভাঙলে আর কোন অর্থসঙ্গতিপূর্ণ শব্দ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক শব্দ বলে। যেমন- গোলাপ, নাক, লাল, তিন, ইত্যাদি। এই শব্দগুলোকে আর ভাঙা যায় না, বা বিশ্লেষণ করা যায় না। আর যদি ভেঙে নতুন শব্দ পাওয়াও যায়, তার সঙ্গে শব্দটির কোন অর্থসঙ্গতি থাকে না। যেমন, উদাহরণের গোলাপ শব্দটি ভাঙলে গোল শব্দটি পাওয়া যায়। কিন্তু গোলাপ শব্দটি গোল শব্দ থেকে গঠিত হয়নি। এই দুটি শব্দের মাঝে কোন অর্থসঙ্গতিও নেই। তেমনি নাক ভেঙে না বানানো গেলেও নাক না থেকে আসেনি। অর্থাৎ, এই শব্দগুলোই মৌলিক শব্দ।গোলাপশব্দটির সঙ্গেপ্রত্যয় যোগ করে আমরাগোলাপীশব্দটি বানাতে পারি। তেমনিনাক’- সঙ্গেফুলশব্দটি যোগ করে আমরানাকফুলশব্দটি গঠন করতে পারি
. সাধিত শব্দ
যে সব শব্দকে বিশ্লেষণ করলে অর্থসঙ্গতিপূর্ণ ভিন্ন একটি শব্দ পাওয়া যায়, তাদেরকে সাধিত শব্দ বলে। মূলত, মৌলিক শব্দ থেকেই বিভিন্ন ব্যাকরণসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় সাধিত শব্দ গঠিত হয়। মৌলিক শব্দ সমাসবদ্ধ হয়ে কিংবা প্রত্যয় বা উপসর্গ যুক্ত হয়ে সাধিত শব্দ গঠিত হয়। যেমন- • সমাসবদ্ধ হয়ে- চাঁদের মত মুখ = চাঁদমুখপ্রত্যয় সাধিত- ডুব+উরি = ডুবুরিউপসর্গযোগে- প্র+শাসন = প্রশাসন
অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ
অর্থগত ভাবে শব্দসমূহকে ভাগে ভাগ করা যায়:
. যৌগিক শব্দ
যে-সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ একই, তাদের যৌগিক শব্দ বলে। অর্থাৎ, শব্দগঠনের প্রক্রিয়ায় যাদের অর্থ পরিবর্তিত হয় না, তাদেরকে যৌগিক শব্দ বলে।

 যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন (অর্থ) অর্থ গায়ক গৈ+অক যে গান করে কর্তব্য কৃ+তব্য যা করা উচিত বাবুয়ানা বাবু+আনা বাবুর ভাব মধুর মধু+ মধুর মত
মিষ্টি গুণযুক্ত দৌহিত্র দুহিতা+ষ্ণ্য (দুহিতা= মেয়ে, ষ্ণ্য= পুত্র) কন্যার মত, নাতি চিকামারা চিকা+মারা দেওয়ালের লিখন
. রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ
প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগে গঠিত যে সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ আলাদা হয়, তাদেরকে রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক/ মূল অর্থ হস্তী হস্ত+ইন হাত আছে যার একটি বিশেষ প্রাণী, হাতি গবেষণা গো+এষণা গরম্ন খোঁজা ব্যাপক অধ্যয়ন পর্যালোচনা বাঁশি বাঁশ+ইন বাঁশ দিয়ে তৈরি বাঁশের তৈরি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র তৈল তিল+ষ্ণ্য তিল থেকে তৈরি সেণহ পদার্থ উদ্ভিদ থেকে তৈরি যে কোন সেণহ পদার্থ প্রবীণ প্র+বীণা প্রকৃষ্টরূপে বীণা বাজায় যিনি অভিজ্ঞ বয়স্ক ব্যক্তি সন্দেশ সম+দেশ সংবাদ মিষ্টান্ন বিশেষ
. যোগরূঢ় শব্দ
সমাস নিষ্পন্ন যে সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ আর ব্যবহারিক অর্থ আলাদা হয়, তাদেরকে যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন- মূল শব্দ শব্দ গঠন ব্যবহারিক অর্থ পঙ্কজ পঙ্কে জন্মে যা পদ্মফুল রাজপুত রাজার পুত্র একটি জাতি বিশেষ, ভারতের একটি জাতি মহাযাত্রা মহাসমারোহে যাত্রা মৃত্যু জলধি জল ধারণ করে যা/ এমন সাগর
. নবসৃষ্ট বা পরিশব্দ বা পারিভাষিক শব্দ
বিভিন্ন বিদেশি শব্দের অনুকরণে ভাবানুবাদমূলক যেসব প্রতিশব্দ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলোকে নবসৃষ্ট বা পরিশব্দ বা পারিভাষিক শব্দ বলে। মূলত প্রচলিত বিদেশি শব্দেরই এরকম পারিভাষিক শব্দ তৈরি করা হয়েছে। যেমন- পারিভাষিক শব্দ মূল বিদেশি শব্দ পারিভাষিক শব্দ মূল বিদেশি শব্দ অম্লজান -Oxygen সচিব Secretary উদযান -Hudrogen স্নাতক -Graduate নথি -File স্নাতকোত্তর -Post Graduate প্রশিক্ষণ -Training সমাপ্তি -Final ব্যবস্থাপক -Manager সাময়িকী -Periodical বেতার -Radio সমীকরণ – Equation
এই বিভিন্ন রকম শব্দের মধ্যে ৫০ হাজার তৎসম; দুই হাজার ৫০০-এর মতো আরবি-ফারসি তুর্কি চার ’; ইংরেজি প্রায় দেড় হাজার; পর্তুগিজ-ফরাসি ১৫০ এবং অন্যান্য বিদেশী-দেশী তদ্ভব শব্দের প্রচলন দেখা যায় বাংলা ভাষাতে যে আট ভাগ বিদেশী শব্দ রয়েছে, সেসব শব্দের বাংলা কোনো প্রতিশব্দ নেই বলেই বাংলা ভাষা তা গ্রহণ করেছে ছাড়া বাংলা ভাষার শব্দগুলো দেশের মাটিতেই জন্মলাভ করেছে
দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া শব্দগুলো দিয়ে যখন মনের অভিব্যক্তি সঠিক এবং পরিস্কারভাবে বুঝানো কষ্টকর হয়ে ওঠে, তখন বাংলা ভাষা তার প্রয়োজনমাফিক সেই শব্দগুলোকে ভেঙে নতুন রূপে তৈরি করে নিয়েছে। যেমন- ‘হস্তগত, হস্তান্তরশব্দদুটি।হস্তএটি তৎসম শব্দ; আধুনিক বাংলা হাত। কোনো বস্তু বা জিনিস হাতে এসেছে এমন অর্থ বুঝাতে বলা হয় হস্তগত হয়েছে। আবার কোনো বস্তুর সত্ত্ব ত্যাগ করা অর্থে হস্তান্তর শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। হাত বলতে মানুষের একটি অঙ্গকে বোঝা যায়, কিন্তু হাত এর সাথেপ্রত্যয় যুক্ত করলে তখন আর অঙ্গ না বুঝিয়ে ভিন্ন একটি বস্তু বোঝায়। এভাবেই দেশে উৎপন্ন শব্দগুলো তার রূপ বদলিয়ে বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। বিদেশী শব্দগুলোও বাংলা ভাষার শব্দের ঘাটতি পূরণে সহায়তা যে করেনি তা নয়।
বিদেশী ভাষার শব্দগুলো বাংলা ভাষার ঘাটতি পূরণে সহায়তা করেছে তার মানে এই নয় যে, বিদেশী সব শব্দকেই অবলীলায় আলিঙ্গন করা যায়। একটি ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রাধান্য পেলে সে ভাষার টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ভাষার আগ্রাসন এখন পৃথিবীসুদ্ধ চলছে। বেশ কয়েকটি ভাষা বিভিন্নভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট ভাষার উপর সুকৌশলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার আগ্রাসন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার অগ্রাসনকেও কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলা ভাষার মানহানি হতে পারে বলে মনে করা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী যখন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক আগ্রাসন চালায়, তখন তাদের ভাষা কৃষ্টি কালচারকে সঙ্গে নিয়েই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। বাংলা ভাষার সুনাম রক্ষার্থে এই দিকটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়তে পারে এবং বিদেশী শব্দগুলোকে সতর্কতার সাথে গ্রহণ করার দাবি রাখে।
বাংলা ভাষাতে সংস্কৃতশব্দের কোনগুলোকে রাখা হবে আর কোন ধরনের শব্দগুলো বাদ দিতে হবে এবং বাংলা ভাষার সামগ্রীক রূপটি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায় তাঁরবাঙ্গালা ভাষানামক নিবন্ধে বলার চেষ্টা করেছেন। নিবন্ধটি ১৩৭ বছর পূর্বে ১২৮৫ বঙ্গাব্দেবঙ্গদর্শনপত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম সাহেব তাঁর নিবন্ধে সংস্কৃত ভাষার বাহুবল থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করে একটি সতন্ত্র রূপ দেয়ার কথা বলেছেন। চলিত ভাষাও যে সাহিত্যের ভাষা বা লেখ্য ভাষা হতে পারে তার প্রমাণ প্রথম মেলে প্যারীচঁাঁদ মিত্র ওরফে টেক চাঁদ ঠাকুর রচিতআলালের ঘরের দুলালগ্রন্থে। গ্রন্থটি চলিত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে। মানুষ যে ঢঙে কথা বলে, সেই চলিত ঢঙের বাংলাতেই গ্রন্থটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আলালের ঘরের দুলাল রচিত হওয়ার আগে বাংলা ভাষার লেখ্য কথ্য এই দুটি রূপ আলাদা আলাদাভাবে চলে আসছিল। লেখ্যরূপ হিসেবে সাধু ভাষা (সংস্কৃত ভাষার শব্দবহুল) এবং কথ্যরূপ হিসেবে চলিত ঢঙ (প্রায় সংস্কৃত শব্দলুপ্ত) ব্যবহার হতে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যে সাবলীল বাক্যে কথা বলেছে, লেখার সময় সেটিকে বাদ দিয়ে সাধু ভাষায় লেখা হয়েছে। অর্থাৎ বইপুস্তকের ভাষা এক এবং কথা বলার ভাষা আরেক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকে ফুলমণি করুণার বিবরণ, আলালের ঘরের দুলাল, হুতুমপেচা, মৃণালিনী ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তখন ভাবা হয়েছিল বাংলা ভাষা এভাবে চলতে থাকলে ক্রমান্বয়ে ভাষার আয়ু হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে জন্য বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ুকল্পেই রচিত হয়েছিল চলিত ভাষাসম্বলিত উল্লিখিত গ্রন্থাদি। এখন মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবেই লেখে এবং সে ভাষাতেই বইপুস্তক রচিত হয়। সেদিন সাধু-চলিত এর সঙ্কট থেকে বাংলা ভাষা অবমুক্ত হয়েছে, কিন্তু আজ বাংলা ভাষা আবার নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিদেশী ভাষার আগ্রাসন সেই সঙ্কটকে আরো গভির করে তুলতে পারে। এই সঙ্কট নিরসন করতে না পারলে ভাষার অস্তিত্বও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।
সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালু হবে এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভাষা অন্দোলনে রক্ত ঝরলেও বাংলা ভাষা সর্বস্তরে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় ইংরেজি হিন্দি ভাষা বাংলা ভাষার বুকে চেপে বসতে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি স্যাটেলাইট মিডিয়ার প্রভাবে হু হু করে বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। কোনোপ্রকার বিচার-বিবেচনা ছাড়াই সেসব শব্দ দেশের মানুষ কথায় কথায় বলছে এবং দলিল-দস্তাবেজ বইপুস্তকে ব্যবহার করছে। ধারা চলতে বাধা না পেলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত পথচলা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হতে পারে।
ভাব অর্থ ঠিকঠাকভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় যে (ভাব অর্থ প্রকাশে) যথোপযুক্ত কোনো শব্দ বাংলা ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে না, বিদেশী কোনো শব্দ হলে সে অর্থ পরিস্কার হয়ে উঠবে সে ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে ভাষার কোনো ক্ষতি না হয়ে ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে। ভাব অর্থের অনুকূল বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও সেসব শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা হলে বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ু স্বল্পদৈর্ঘ্য হতে পারে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, বহু মানুষ কথায় কথায় ইংরেজি হিন্দি শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। যেমনÑ ফল কিনতে যাচ্ছি ; না বলে বলা হচ্ছেফ্রুট কিনতে যাচ্ছি ঠিক আছে না বলে বলা হচ্ছেদ্যাট্স ওকে উপায় নেই না বলে বলা হচ্ছেনো ওয়ে দুঃখিত না বলে বলা হচ্ছেস্যরি জাদুকর না বলে বলা হচ্ছেম্যাজিশিয়ান লেখক না বলে বলা হচ্ছেরাইটার শিক্ষক না বলে বলছেটিচার চাচা-চাচী, খালা-খালু, মামা-মামী না বলে বলা হচ্ছে আঙ্কেল-আন্টি। খালাত ভাই, খালাত বোন; মামাত ভাই, মামাত বোন; ফুফাত ভাই, ফুফাত বোনকে বুঝাতেকাজিনবলা হচ্ছে।কাজিনবলতে কী খালাত বোনকে বোঝাবে না মামাত ভাইকে বুঝাবে? স্পষ্ট নয়, অথচ বাংলা ভাষায় এই সম্পর্কগুলোকে পরিস্কার করে বোঝানোর জন্য আলাদা আলাদা শব্দ থাকলেও বিদেশী শব্দকেকাজিনব্যবহার করা হচ্ছে। এই ছোট ছোট ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দগুলোই ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়ে বাংলা ভাষার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এভাবে বাংলা শব্দকে বাদ দিয়ে ইংরেজি শব্দের চর্চাতে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা নাও হতে পারে। কোনো বাক্যের অর্ধেকটা ইংরেজি আর অর্ধেকটা বাংলা বলা হলে সময়ের ব্যবধানে বাকি অর্ধেক বাংলা ব্যাক্যটাও ইংরেজি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটিই ভাষার আগ্রাসন। এভাবেই একটি ভাষাকে অন্য একটি ভাষা গ্রাস করে ফেলতে পারে। একটি ভাষার উপর আর একটি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। একজন মনুষ একাধিক ভাষা আয়ত্ব করতে পারে তাতে দোষের কিছু নেই বহুভাষির জন্য কথা বলার সময় বা লিখার সময় খেয়াল রাখা জরুরি যে, একটি ভাষাতেই বাক্যপূর্ণ করে কথা বলা হচ্ছে কি না। বাক্য পরিপূর্ণ করতে একসাথে একাধিক ভাষার শব্দ ব্যবহার না করাই সমীচীন। যদি লেখার সময় বা বলার সময় ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেই