Saturday, November 28, 2015

নৌকার সারি ও নদীমাতৃক বাংলাদেশ

নৌকার সারি ও নদীমাতৃক বাংলাদেশ

“তুমি বেশ বদলে গেছো...পুরনো সৈকতে আর পানসি ভেড়াও না’ কিংবা ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’ একসময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াত কিংবা নতুন বৌকে নৌকায় চড়িয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আনার সময় মাঝি-মাল্লা এসব ভাটিয়ালী, মুর্শিদী ও মারিফতি গানে মন কেড়ে নিতো।
সে সময় খাল ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের চলাচলের একমাত্র ও অন্যতম মাধ্যম ছিলো পালতোলা পানসি, গয়না, ছুঁইওয়ালা (একমালাই) ও রাজাপুরী নৌকা। এছাড়াও জমিদারদের চলাচলের জন্য ময়ূরপঙ্খী, ধণাঢ্য ব্যক্তিদের জন্য বজরা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য সাম্পান, বালার ও বাতনাই নৌকার প্রচলনছিলো। কালের বিবর্তনে এখন নদী, খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে প্রাচীণ ঐতিহ্যের চিরচেনা এসব নৌকা। এখন কালে ভদ্রে কোথাও এসব নৌকার দেখা মেলেনা। তবে এখনও বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের বিলাঞ্চলবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র বাহনই হচ্ছে নৌকা।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া পণ্য পরিবহণ ও জেলেদের মাছ ধরার কাজে নৌকার ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে নৌকা প্রচুর ব্যবহার হয়। নৌকার চালককে বলা হয় মাঝি। নৌকার বিভিন্ন অংশ হলো-খোল, পাটা, ছই বা ছাউনী, হাল, দাঁড়, পাল, পালের দড়ি, মাস্তল, নোঙর, গলুই, বৈঠা, লগি ও গুণ। নৌকা প্রধানত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। মাছ ধরার ডিঙ্গি আকারে ছোট, আবার পণ্য পরিবহণের নৌকা আকারে বেশ বড়। ছই বা ছাউনী তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করা হয়।
নৌকার খোলকে জলনিরোধ করার জন্য আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। লগি তৈরি হয় বাঁশ থেকে। পাল তৈরি হয় শক্ত কাপড় জোড়া দিয়ে। গঠনশৈলী ও পরিবহণের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকার প্রচলন রয়েছে যেমন-ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, কোষা, ডিঙ্গি, পাতাম, বাচারি, রপ্তানি, ঘাসি ও সাম্পান। নববইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় ইঞ্জিন লাগানো শুরু হয়। ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলি শ্যালো নৌকা নামে পরিচিত।
নৌকার কথা উঠলেই একগুচ্ছ কবিতার কথা মনে পড়ে যায় তার মধ্যে কবি সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের দূর পাল্লা চমৎকার ছন্দের কবিতাটি তার মধ্যে অন্যতম।
দূর পাল্লা
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ছিপখান তিনদাঁড়
তিনজন মাল্লা,
চৌপর দিনভর
দেয় দূরপাল্লা।
কঞ্চির তীরঘর
ঐ চর জাগছে,
বুনোহাঁস ডিম তার
শ্যাওলায় ঢাকছে।
চুপচুপ ঐ ডুব
দেয় পানকোটি,
দেয় ডুব টুপটুপ
ঘোমটার বউটি।
লকলক শরবন
বক তায় মগ্ন,
চুপচাপ চারদিক
সন্ধ্যার লগ্ন।
আর জোর দেড় ক্রোশ
জোর দেড় ঘন্টা,
টান ভাই টান সব
নেই উৎকণ্ঠা।

Saturday, November 28, 2015

নৌকার সারি ও নদীমাতৃক বাংলাদেশ

নৌকার সারি ও নদীমাতৃক বাংলাদেশ

“তুমি বেশ বদলে গেছো...পুরনো সৈকতে আর পানসি ভেড়াও না’ কিংবা ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’ একসময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াত কিংবা নতুন বৌকে নৌকায় চড়িয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আনার সময় মাঝি-মাল্লা এসব ভাটিয়ালী, মুর্শিদী ও মারিফতি গানে মন কেড়ে নিতো।
সে সময় খাল ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের চলাচলের একমাত্র ও অন্যতম মাধ্যম ছিলো পালতোলা পানসি, গয়না, ছুঁইওয়ালা (একমালাই) ও রাজাপুরী নৌকা। এছাড়াও জমিদারদের চলাচলের জন্য ময়ূরপঙ্খী, ধণাঢ্য ব্যক্তিদের জন্য বজরা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য সাম্পান, বালার ও বাতনাই নৌকার প্রচলনছিলো। কালের বিবর্তনে এখন নদী, খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে প্রাচীণ ঐতিহ্যের চিরচেনা এসব নৌকা। এখন কালে ভদ্রে কোথাও এসব নৌকার দেখা মেলেনা। তবে এখনও বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের বিলাঞ্চলবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র বাহনই হচ্ছে নৌকা।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া পণ্য পরিবহণ ও জেলেদের মাছ ধরার কাজে নৌকার ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে নৌকা প্রচুর ব্যবহার হয়। নৌকার চালককে বলা হয় মাঝি। নৌকার বিভিন্ন অংশ হলো-খোল, পাটা, ছই বা ছাউনী, হাল, দাঁড়, পাল, পালের দড়ি, মাস্তল, নোঙর, গলুই, বৈঠা, লগি ও গুণ। নৌকা প্রধানত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। মাছ ধরার ডিঙ্গি আকারে ছোট, আবার পণ্য পরিবহণের নৌকা আকারে বেশ বড়। ছই বা ছাউনী তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করা হয়।
নৌকার খোলকে জলনিরোধ করার জন্য আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। লগি তৈরি হয় বাঁশ থেকে। পাল তৈরি হয় শক্ত কাপড় জোড়া দিয়ে। গঠনশৈলী ও পরিবহণের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকার প্রচলন রয়েছে যেমন-ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, কোষা, ডিঙ্গি, পাতাম, বাচারি, রপ্তানি, ঘাসি ও সাম্পান। নববইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় ইঞ্জিন লাগানো শুরু হয়। ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলি শ্যালো নৌকা নামে পরিচিত।
নৌকার কথা উঠলেই একগুচ্ছ কবিতার কথা মনে পড়ে যায় তার মধ্যে কবি সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের দূর পাল্লা চমৎকার ছন্দের কবিতাটি তার মধ্যে অন্যতম।
দূর পাল্লা
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ছিপখান তিনদাঁড়
তিনজন মাল্লা,
চৌপর দিনভর
দেয় দূরপাল্লা।
কঞ্চির তীরঘর
ঐ চর জাগছে,
বুনোহাঁস ডিম তার
শ্যাওলায় ঢাকছে।
চুপচুপ ঐ ডুব
দেয় পানকোটি,
দেয় ডুব টুপটুপ
ঘোমটার বউটি।
লকলক শরবন
বক তায় মগ্ন,
চুপচাপ চারদিক
সন্ধ্যার লগ্ন।
আর জোর দেড় ক্রোশ
জোর দেড় ঘন্টা,
টান ভাই টান সব
নেই উৎকণ্ঠা।