Thursday, August 20, 2015

জীবনানন্দ দাশের ভালোবাসার কবিতা



















বনলতা সেন

- জীবনানন্দ দাশ


হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন

লোকেন বোসের জর্নাল

 - জীবনানন্দ দাশ
 
সুজাতাকে ভালোবাসাতাম আমি -
এখন কি ভালোবাসি?
সেটা অবসরে ভাববার কথা,
অবসর তবু নেই;
তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে;
এখন শেল্‌ফে চার্বাক ফ্রয়েড প্লেটো পাভলভ ভাবে
সুজাতাকে আমি ভালোবাসি কিনা।

পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:
সুজাতা লিখেছে আমার কাছে,
বারো তেরো কুড়ি বছর আগের সে-সব কথা;
ফাইল নাড়া কী যে মিহি কেরানির কাজ;
নাড়বো না আমি,
নেড়ে কার কী সে লাভ;
মনে হয় যেন অমিতা সেনের সাথে সুবলের ভাব,
সুবলেরই শুধু? অবশ্য আমি
তাকে মানে -এই অমি তা বলছি যাকে -
কিন্তু কথাটা থাক;
কিন্তু তবুও-
আজকে হৃদয় পথিক নয় তো আর,
নারী যদি মৃগতৃষ্ণার মতো - তবে
এখন কী করে মন ক্যারাভান হবে।

প্রৌঢ় হৃদয়, তুমি
সেই সব মৃগতৃষ্ণিকাতালে ঈষৎ সিমুমে

 হয়তো কখনো বৈতাল মরুভূমি,
হৃদয়, হৃদয় তুমি!
তারপর তুমি নিজের ভিতরে এসে তবু চুপে
মরীচিকা জয় করেছ বিনয়ী যে ভীষণ নামরূপেে -
সেখানে বালির সৎ নীরবতা ধু ধু
প্রেম নয় তবু প্রেমেরই মতন শুধু।

অমিতা সেনকে সুবল কি ভালোবাসে?
অমিতা নিজে কি তাকে?
অবসরমতো কথা ভাবা যাবে,
ঢের অবসর চাই;
দূর ব্রহ্মাণ্ডকে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া চাই;
এখুনি টেনিসে যেতে হবে তবু,
ফিরে এসে রাতে ক্লবে;
কখন সময় হবে।

হেমন্তে ঘাসে নীল ফুল ফোটে -
হৃদয় কেন যে কাঁপে,
“ভালোবাসতাম” - স্মৃতি - অঙ্গার - পাপে
তর্কিত কেন রয়েছে বর্তমান।
সে-ও কি আমায় -সুজাতা আমায় ভালোবেসে ফেলেছিল।
আজও ভালোবাসে না কি?
ইলেক্‌ট্রনেরা নিজ দোষগুণে বলয়িত হয়ে রবে;
কোনো অন্তিম ক্ষালিত আকাশে এর উত্তর হবে?

সুজাতা এখন ভুবনেশ্বরে;
অমিতা কি মিহিজামে?
বহুদিন থেকে ঠিকানা না জেনে ভালোই হয়েছে-সবই।
ঘাসের ভিতরে নীল শাদা ফুল ফোটে হেমন্তরাগে;
সময়ের এই স্থির এক দিক,
তবু স্থিরতর নয়;
প্রতিটি দিনের নতুন জীবাণু আবার স্থাপিত হয়। 


 আমাকে একটি কথা দাও

 - জীবনানন্দ দাশ

আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতো
সহজ মহৎ বিশাল,
গভীর; - সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভুকদের রক্তে
মলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন,
আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারীর।
সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাসের মতো:
সেই দিনের - আলোর অন্তহীন এঞ্জিন চঞ্চল ডানার মতন
সেই উজ্জ্বল পাখিনীর - পাখির সমস্ত পিপাসাকে যে
অগ্নির মতো প্রদীপ্ত দেখে অন্তিম শরীরিণী মোমের মতন।


 নির্জন স্বাক্ষর

  - জীবনানন্দ দাশ
 

তুমি তো জানো না কিছু - না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;
যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে -
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের 'পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষ'য়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের 'পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে?
আমি ঝ'রে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ'রে সেদিন পৃথিবীর 'পরে,
- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।


 কুড়ি বছর পরে

   - জীবনানন্দ দাশ

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি।
আবার বছর কুড়ি পরে–
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে কার্তিকের মাসে–
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে–তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়–মাঠের ভিতরে।

অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর;
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীরের থেকে খড় ছড়াতেছে;
মনিয়ার ঘরে রাত, শীত, আর শিশিরের জল।

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার–
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার।

হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু সরু কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের–আমের;
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার–
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার-আমার!

তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে–
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে।
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে–

সোনালি সোনালি চিল–শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে–
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে।


যাত্রী

   - জীবনানন্দ দাশ

 মনে হয় প্রাণ এক দূর স্বচ্ছ সাগরের কূলে
জন্ম নিয়েছিলো কবে;
পিছে মৃত্যুহীন জন্মহীন চিহ্নহীন
কুয়াশার যে ইঙ্গিত ছিলো --
সেই সব ধীরে ধীরে ভুলে গিয়ে অন্য এক মানে
পেয়েছিলো এখানে ভূমিষ্ঠ হয়ে -- আলো জল আকাশের টানে;
কেন যেন কাকে ভালোবেসে!




তবু 


   - জীবনানন্দ দাশ

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী
মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে
উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার
বছরে বয়সী আমি;
বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে
চলে যেতে দেখে - তবু - অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা ক’রে
এখানে তোমার কাছে দাঁড়ায়ে রয়েছি;
আজ ভোরে বাংলার তেরোশো চুয়ান্ন সাল এই
কোথাও নদীর জলে নিজেকে গণনা করে নিতে ভুলে গিয়ে
আগামী লোকের দিকে অগ্রসর হয়ে যায়; আমি
তবুও নিজেকে রোধ করে আজ থেমে যেতে চাই
তোমার জ্যোতির কাছে; আড়াই হাজার
বছর তা হলে আজ এইখানেই শেষ হয়ে গেছে।

নদীর জলের পথে মাছরাঙা ডানা বাড়াতেই
আলো ঠিকরায়ে গেছে -যারা পথে চলে যায় তাদের হৃদয়ে;
সৃষ্টির প্রথম আলোর কাছে; আহা,
অন্তিম আভার কাছে; জীবনের যতিহীন প্রগতিশীলতা
নিখিলের স্মরণীয় সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেছে; দেখ
পাখি চলে, তারা চলে, সূর্য মেঘে জ্বলে যায়, আমি
তবুও মধ্যম পথে দাঁড়ায়ে রয়েছি -তুমি দাঁড়াতে বলো নি।
আমাকে দেখ নি তুমি; দেখাবার মতো
অপব্যয়ী কল্পনার ইন্দ্রত্বের আসনে আমাকে
বসালে চকিত হয়ে দেখে যেতে যদি -তবু, সে আসনে আমি
যুগে যুগে সাময়িক শত্রুদের বসিয়েছি, নারি,
ভালোবেসে ধ্বংস হয়ে গ্যাছে তারা সব।
এ রকম অন্তহীন পটভূমিকায় - প্রেমে -
নতুন ঈশ্বরদের বারবার লুপ্ত হতে দেখে
আমারও হৃদয় থেকে তরুণতা হারিয়ে গিয়েছে;
অথচ নবীন তুমি।
নারি, তুমি সকালের জল উজ্জ্বলতা ছাড়া পৃথিবীর কোন নদীকেই
বিকেলে অপর ঢেউয়ে খরশান হতে
দিতে ভুলে গিয়েছিলে; রাতের প্রখর জলে নিয়তির দিকে
বহে যেতে দিতে মনে ছিলো কি তোমার?
এখনও কি মনে নেই?

আজ এই পৃথিবীর অন্ধকারে মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস
কেবলই শিথিল হয়ে যায়; তবু তুমি
সেই শিথিলতা নও, জানি, তবু ইতিহাসরীতিপ্রতিভার
মুখোমুখি আবছায়া দেয়ালের মতো নীল আকাশের দিকে
উর্ধ্বে উঠে যেতে চেয়ে তুমি
আমাদের দেশে কোনো তুমি বিশ্বাসের দীর্ঘ তরু নও।

তবু
কী যে উদয়ের সাগরের প্রতিবিম্ব জ্বলে ওঠে রোদ!
উদয় সমাপ্ত হয়ে গেছে নাকি সে অনেক আগে?
কোথাও বাতাস নেই, তবু
মর্মরিত হয়ে ওঠে উদয়ের সমুদ্রের পারে।
কোনো পাখি
কালের ফোকরে আজ নেই, তবু, নব সৃষ্টিমরালের মতো কলস্বরে
কেন কথা বলি; কোনো নারী
নেই, তবু আকাশহংসীর কণ্ঠে ভোরের সাগর উতরোল।


অন্য প্রেমিককে

 - জীবনানন্দ দাশ

মাছরাঙা চ'লে গেছে - আজ নয় কবেকার কথা;
তারপর বারবার ফিরে এসে দৃশ্যে উজ্জল।
দিতে চেয়ে মানুষের অবহেলা উপেক্ষায় হ'য়ে গেছে ক্ষয়;
বেদনা পেয়েছে তবু মানুষের নিজেরও হৃদয়
প্রকৃতির অনির্বচনীয় সব চিহ্ন থেকে দু' চোখ ফিরিয়ে;
বুদ্ধি আর লালসার সাধনাকে সব চেয়ে বড় ভেবে নিয়ে।

মাছরাঙা চ'লে গেছে --আজ নয় কবেকার কথা;
তারপর বারবার ফিরে এসে ডানাপালকের উজ্জলতা
ক্ষয় ক'রে তারপর হয়ে গেছে ক্ষয়।
মাছরাঙা মানুষের মতো সূর্য নয়?
কাজ করে কথা ব'লে চিন্তা করে চলেছে মানব;
যদিও সে শ্রেষ্ঠ চিন্তা সারাদিন চিন্তানাশা সাগরের জলে
ডুবে গিয়ে নিঃশব্দতা ছাড়া আর অন্য কিছু বলে?


 সে

  - জীবনানন্দ দাশ

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;
বলেছিলো: 'এ নদীর জল
তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল:
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এই নদী তুমি।'

'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?'
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।

সময়ের অবিরল শাদা আর কালো
বনানীর বুক থেকে এসে
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে
ঢের আগে নারী এক - তবু চোখ ঝলসানো আলো
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।


 সূর্য নক্ষত্র নারী

   - জীবনানন্দ দাশ

তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিল
সব চেয়ে আগে; জানি আমি।
সে দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই।
তুমি যে এ পৃথিবীতে রয়ে গেছ
আমাকে বলে নি কেউ।
কোথাও জলকে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জল
রয়ে গেছে -
যে যার নিজের কাজে আছে, এই অনুভবে চ’লে
শিয়রে নিয়ত স্ফীত সূর্যকে চেনে তারা;
আকাশের সপ্রতিভ নক্ষত্রকে চিনে উদীচীর
কোনো জল কী করে অপর জল চিনে নেবে অন্য নির্ঝরের?
তবুও জীবন ছুঁয়ে গেলে তুমি;
আমার চোখের থেকে নিমেষনিহত
সূর্যকে সরায়ে দিয়ে।

স’রে যেত; তবুও আয়ুর দিন ফুরোবার আগে
নব নব সূর্যকে নারীর বদলে
ছেড়ে দেয়? কেন দেব? সকল প্রতীতি উৎসবের
চেয়ে তবু বড় স্থিরতর প্রিয় তুমি; - নিঃসূর্য নির্জন
করে দিতে এলে।
মিলন ও বিদায়ের প্রয়োজনে আমি যদি মিলিত হতাম
তোমার উৎসের সাথে, তবে আমি অন্য সব প্রেমিকের মতো
বিরাট পৃথিবী আর সুবিশাল সময়কে সেবা করে আত্মস্থ হতাম।
তুমি তা জানো না, তবু, আমি জানি, একবার তোমাকে দেখেছি—
পিছনের পটভূমিকায় সময়ের
শেষনাগ ছিল, নেই -বিজ্ঞানের ক্লান্ত নক্ষত্রেরা
নিভে যায় -মানুষ অপরিজ্ঞাত সে অমায়; তবুও তাদের একজন
গভীর মানুষী কেন নিজেকে চেনায়!
আহা, তাকে অন্ধকার অনন্তের মতো আমি জেনে নিয়ে, তবু,
অল্পায়ু রঙিন রৌদ্রে মানবের ইতিহাসে কে না জেনে কোথায় চলেছি!

দুই
চারি দিকে সৃজনের অন্ধকার রয়ে গেছে, নারি,
অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালো
কোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালে
তোমার শরীর সব আলোকিত করে দিয়ে স্পষ্ট করে দেবে কোনো কালে
শরীরে যা রয়ে গেছে।
এইসব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে
নতুন সময় গ’ড়ে নিজেকে না গ’ড়ে তবু তুমি
ব্রহ্মাণ্ডের অন্ধকারে একবার জন্মাবার হেতু
অনুভব করেছিল -
জন্ম-জন্মান্তরের মৃত স্মরণের সাঁকো
তোমার হৃদয় স্পর্শ করে ব’লে আজ
আমাকে ইশারাপাত করে গেলে তারই; -
অপার কালের স্রোত না পেলে কী ক’রে তবু, নারি,
তুচ্ছ, খণ্ড, অল্প সময়ের স্বত্ব কাটায়ে অঋনী তোমাকে কাছে পাবে -
তোমার নিবিড় নিজ চোখ এসে নিজের বিষয় নিয়ে যাবে?
সময়ের কক্ষ থেকে দূর কক্ষে চাবি
খুলে ফেলে তুমি অন্য সব মেয়েদের
আত্মঅন্তরঙ্গতার দান
দেখায়ে অনঙ্ককাল ভেঙে গেলে পরে,
যে দেশে নক্ষত্র নেই—কোথাও সময় নেই আর -
আমারও হৃদয় নেই বিভা -
দেখাবে নিজের হাতে -অবশেষে -কী মকরকেতনে প্রতিভা।

তিন

তুমি আছ জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে অতীত আর
যেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম,
তাই শুধু কাটায়েছি।
কাটায়ে জেনেছি এই-ই শূন্য,তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোনো নাম।
অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো
দ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চলে যাওয়া।
শোককে স্বীকার ক’রে অবশেষে তবে
নিমেষের শরীরের উজ্জ্বলায় অনন্তের জ্ঞানপাপ মুছে দিতে হবে।
আজ এই ধ্বংসমত্ত অন্ধকার ভেদ ক’রে বিদ্যুতের মতো
তুমি যে শরীর নিয়ে রয়ে গেছ, সেই কথা সময়ের মনে
জানাবার আধার কি একজন পুরুষের নির্জন শরীরে
একটি পালক শুধু -হৃদয়বিহীন সব অপার আলোকবর্ষ আলোকবর্ষ ঘিরে?
অধঃপতিত এই অসময়ে কে-বা সেই উপচার পুরুষমানুষ?—
ভাবি আমি—জানি আমি, তবু
সে কথা আমাকে জানাবার
হৃদয় আমার নেই -
যে-কোনো প্রেমিক আজ এখন আমার
দেহের প্রতিভূ হয়ে নিজের নারীকে নিয়ে পৃথিবীর পথে
একটি মুহূর্তে যদি আমার অনন্ত হয় মহিলার জ্যোতিষ্কজগতে। 


 অবরোধ

   - জীবনানন্দ দাশ
  
বহুদিন আমার এ হৃদয়কে অবরোধ ক’রে রয়ে গেছে;
হেমন্তের স্তব্ধতায় পুনরায় করে অধিকার ।
কোথায় বিদেশে যেন
এক তিল অধিক প্রবীণ এক নীলিমার পারে
তাহাকে দেখিনি আমি ভালো ক’রে -তবু মহিলার
মনন-নিবিড় প্রাণ কখন আমার চোখঠারে
চোখ রেখে ব’লে গিয়েছিল :
‘সময়ের গ্রন্থি সনাতন, তবু সময়ও তা বেঁধে দিতে পারে?’

বিবর্ণ জড়িত এক ঘর;
কী ক’রে প্রাসাদ তাকে বলি আমি?
অনেক ফাটল নোনা আরসোলা কৃকলাস দেয়ালের ՚পর
ফ্রেমের ভিতরে ছবি খেয়ে ফেলে অনুরাধাপুর -ইলোরার;
মাতিসের -সেজানের - পিকাসোর;
অথবা কিসের ছবি? কিসের ছবির হাড়গোড়?

কেবল আধেক ছায়া -
ছায়ায় আশ্চর্য সব বৃত্তের পরিধি রয়ে গেছে ।
কেউ দেখে -কেউ তাহা দেখে নাকো -আমি দেখি নাই।
তবু তার অবলঙ কালো টেবিলের পাশে আধাআধি চাঁদনীর রাতে
‍মনে পড়ে আমিও বসেছি একদিন ।
কোথাকার মহিলা সে? কবেকার? -ভারতী নর্ডিক গ্রিক মুশ্লিম মার্কিন?
অথবা সময় তাকে শনাক্ত করে না আর;
সর্বদাই তাকে ঘিরে আধো-অন্ধকার;
চেয়ে থাকি -তবুও সে পৃথিবীর ভাষা ছেড়ে পরিভাষাহীন।
মনে পড়ে সেখানে উঠোনে এক দেবদারু গাছ ছিল।
তারপর সূর্যালোকে ফিরে এসে মনে হয় এইসব দেবদারু নয়।
সেই খানে তম্বুরার শব্দ ছিল ।
পৃথিবীতে দুন্দুভি বেজে ওঠে -বেজে ওঠে; সুর তান লয়
গান আছে পৃথিবীতে জানি, তবু গানের হৃদয় নেই।
একদিন রাত্রি এসে সকলের ঘুমের ভিতরে
আমাকে একাকী জেনে ডেকে নিল―অন্য এক ব্যবহারে
মাইলটাক দূরে পুরোপুরি।
সবি আছে -খুব কাছে; গোলকধাঁধার পথে ঘুরি
তবুও অনন্ত মাইল তারপর -কোথাও কিছুই নেই ব’লে।
অনেক আগের কথা এইসব -এই
সময় বৃত্তের মতো গোল ভেবে চুরুটের আস্ফোটে জানুহীন, মলিন সমাজ
সেই দিকে অগ্রসর হয় রোজ -একদিন সেই দেশ পাবে ।
সেই নারী নেই আর ভুলে তারা শতাব্দীর অন্ধকার ব্যসনে ফুরাবে ।



নির্জন স্বাক্ষর

  - জীবনানন্দ দাশ

 তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক'রে!
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! -
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!
আমি ঝরে যাব, তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!
রয়েছি সবুজ মাঠে - ঘাসে -
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে-আকাশে;
জীবনের রঙ তবু ফলানো কি হয়
এইসব ছুঁয়ে ছেনে!—সে এক বিস্ময়
পৃথিবীতে নাই তাহা - আকাশেও নাই তার স্থল -
চেনে নাই তারে অই সমুদ্রের জল!
রাতে রাতে হেঁটে হেঁটে নক্ষত্রের সনে
তারে আমি পাই নাই; কোনো এক মানুষীর মনে!
কোনো এক মানুষের তরে যে জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে!
নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দ আসনে
কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে!
একবার কথা ক’য়ে দেশ আর দিকের দেবতা
বোবা হয়ে পড়ে থাকে - ভুলে যায় কথা!
যে-আগুন উঠেছিল তাদের চোখের তলে জ্ব’লে
নিভে যায় - ডুবে যায় - তারা যায় স্খ’লে -
নতুন আকাঙ্খা আসে—চলে আসে নতুন সময়—
পুরানো সে নক্ষত্রের দিন শেষ হয়,
নতুনেরা আসিতেছে ব’লে! -
আমার বুকের থেকে তবুও কি পড়িয়াছে স্খলে
কোনো এক মানুষীর তরে
যেই প্রেম জ্বালায়েছি পুরোহিত হয়ে তার বুকের উপরে!
আমি সেই পুরোহিত -সেই পুরোহিত!—
যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত
লাগিতেছে আমার শরীরে -
যেই তারা জেগে আছে, তার দিকে ফিরে
তুমি আছো জেগে -
যে আকাশ জ্বলিতেছে, তার মতো মনের আবেগে
জেগে আছো -জানিয়াছো তুমি এক নিশ্চয়তা - হয়েছো নিশ্চয়!
হয়ে যায় আকাশের তলে কত আলো -কত আগুনের ক্ষয়;
কতবার বর্তমান হয়ে গেছে ব্যথিত অতীত -
তবুও তোমার বুকে লাগে নাই শীত
যে নক্ষত্র ঝরে যায় তার! যে পৃথিবী জেগে আছে, তার ঘাস -আকাশ তোমার!
জীবনের স্বাদ লয়ে জেগে আছো—তবুও মৃত্যুর ব্যথা দিতে
পার তুমি; তোমার আকাশে তুমি উষ্ণ হয়ে আছো, তবু -
বাহিরের আকাশের শীতে
নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়,
নক্ষত্রের মতন হৃদয়
পড়িতেছে ঝ’রে -
ক্লান্ত হয়ে -শিশিরের মতো শব্দ ক’রে!
জাননাকো তুমি তার স্বাদ,
তোমারে নিতেছে ডেকে জীবন অবাধ,
জীবন অগাধ!
হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন -
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে? - অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার আকাশ - আলো - জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!
আমি চলে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেই দিন পৃথিবীর ’পরে;—
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক'রে!


সিন্ধুসারস

   - জীবনানন্দ দাশ

 দু-এক মুহূর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে তুমি আর আমি
হে সিন্ধুসারস,
মালাবার পাহাড়ের কোল ছেড়ে অতি দূর তরঙ্গের জানালায় নামি
নাচিতেছ টারান্‌টেলা - রহস্যের ; আমি এই সমুদ্রের পারে চুপে থামি
চেয়ে দেখি বরফের মতো শাদা রৌদ্র, সবুজ ঘাসের মত প্রাণ
শৈলের গহ্বর থেকে অন্ধকার তরঙ্গেরে করিছে আহ্বান।

জানো কি অনেক যুগ চলে গেছে ? মরে গেছে অনেক নৃপতি ?
অনেক সোনার ধান ঝরে গেছে জানো না কি ? অনেক গহন ক্ষতি

আমাদের ক্লান্ত করে দিয়ে - হারায়েছি আনন্দের গতি;
ইচ্ছা, চিন্তা, স্বপ্ন, ব্যথা, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, এই বর্তমান
হৃদয়ে বিরস গান গাহিতেছে আমাদের—বেদনার আমরা সন্তান?
জানি পাখি, শাদা পাখি, মালাবার ফেনার সন্তান,
তুমি পিছে চাহো নাকো, তোমার অতীত নেই, স্মৃতি নেই,
বুকে নেই আকীর্ণ ধূসর
পাণ্ডুলিপি; পৃথিবীর পাখিদের মতো নেই শীতরাতে
ব্যথা আর কুয়াশার ঘর।
যে রক্ত ঝরেছে তারে স্বপ্নে বেঁধে কল্পনার নিঃসঙ্গ প্রভাত
নেই তব; নেই নিন্মভুমি- নেই আনন্দের অন্তরালে
প্রশ্ন আর চিন্তার আঘাত।
স্বপ্ন তুমি দেখ নি তো - পৃথিবীর সব পথ সব সিন্ধু ছেড়ে দিয়ে একা
বিপরীত দ্বীপে দূরে মায়াবীর আরশিতে হয় শুধু দেখা
রূপসীর সাথে এক ; সন্ধ্যার নদির ঢেউয়ে আসন্ন গল্পের মতো রেখা
প্রাণে তার - ম্লান চুল, চোখ তার হিজল বনের মতো কালো ;
একবার স্বপ্নে তারে দেখে ফেলে পৃথিবীর সব স্পষ্ট আলো
নিভে গেছে; যেখানে সোনার মধু ফুরায়েছে, করে না বুনন
মাছি আর ; হলুদ পাতার গন্ধে ভরে ওঠে অবিচল শালিকের মন
মেঘের দুপুর ভাসে - সোনালি চিলের বুক হয় উন্মন
মেঘের দুপুরে, আহা, ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে;
সেখানে আকাশে কেউ নেই আর, নেই আর পৃথিবীর ঘাসে।

তুমি সেই নিস্তব্ধতা চেনো নাকো; অথবা রক্তের পথে
পৃথিবীর ধূলির ভিতরে
জানো নাকো আজও কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্রী মাছির মতো ঝরে;
সৌন্দর্য রাখিছে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে;
গভীর নিলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের - ইন্দ্রধনু ধরিবার ক্লান্ত আয়োজন
হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।

এই সব জানোনাকো প্রবালপঞ্জর ঘিরে ডানার উল্লাসে;
রৌদ্রে ঝিলমিল করে শাদা ডানা, শাদা ফেনা-শিশুদের পাশে
হেলিওট্রোপের মতো দুপুরের অসীম আকাশে!
ঝিকমিক করে রৌদ্রে বরফের মতো শাদা ডানা,
যদিও এ পৃথিবীর স্বপ্ন চিন্তা সব তার অচেনা অজানা।

চঞ্চল শরের নীড়ে কবে তুমি - জন্ম তুমি নিয়েছিলে কবে,
বিষণ্ণ পৃথিবী ছেড়ে দলে দলে নেমেছিলে সবে
আরব সমুদ্রে, আর চীনের সাগরে -দূর ভারতের সিন্ধুর উৎসবে।
শীতার্ত এ পৃথিবীর আমরণ চেষ্টা ক্লান্তি বিহ্বলতা ছিঁড়ে
নেমেছিলে কবে নীল সমুদ্রের নীড়ে।

ধানের রসের গল্প পৃথিবীর - পৃথিবীর নরম অঘ্রান
পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই—আর তার প্রেমিকের ম্লান
নিঃসঙ্গ মুখের রুপ, বিশুস্ক তৃণের মতো প্রাণ,
জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না ; কলরব ক’রে উড়ে যায়
শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তিব্রতায়।

Thursday, August 20, 2015

জীবনানন্দ দাশের ভালোবাসার কবিতা



















বনলতা সেন

- জীবনানন্দ দাশ


হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন

লোকেন বোসের জর্নাল

 - জীবনানন্দ দাশ
 
সুজাতাকে ভালোবাসাতাম আমি -
এখন কি ভালোবাসি?
সেটা অবসরে ভাববার কথা,
অবসর তবু নেই;
তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে;
এখন শেল্‌ফে চার্বাক ফ্রয়েড প্লেটো পাভলভ ভাবে
সুজাতাকে আমি ভালোবাসি কিনা।

পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:
সুজাতা লিখেছে আমার কাছে,
বারো তেরো কুড়ি বছর আগের সে-সব কথা;
ফাইল নাড়া কী যে মিহি কেরানির কাজ;
নাড়বো না আমি,
নেড়ে কার কী সে লাভ;
মনে হয় যেন অমিতা সেনের সাথে সুবলের ভাব,
সুবলেরই শুধু? অবশ্য আমি
তাকে মানে -এই অমি তা বলছি যাকে -
কিন্তু কথাটা থাক;
কিন্তু তবুও-
আজকে হৃদয় পথিক নয় তো আর,
নারী যদি মৃগতৃষ্ণার মতো - তবে
এখন কী করে মন ক্যারাভান হবে।

প্রৌঢ় হৃদয়, তুমি
সেই সব মৃগতৃষ্ণিকাতালে ঈষৎ সিমুমে

 হয়তো কখনো বৈতাল মরুভূমি,
হৃদয়, হৃদয় তুমি!
তারপর তুমি নিজের ভিতরে এসে তবু চুপে
মরীচিকা জয় করেছ বিনয়ী যে ভীষণ নামরূপেে -
সেখানে বালির সৎ নীরবতা ধু ধু
প্রেম নয় তবু প্রেমেরই মতন শুধু।

অমিতা সেনকে সুবল কি ভালোবাসে?
অমিতা নিজে কি তাকে?
অবসরমতো কথা ভাবা যাবে,
ঢের অবসর চাই;
দূর ব্রহ্মাণ্ডকে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া চাই;
এখুনি টেনিসে যেতে হবে তবু,
ফিরে এসে রাতে ক্লবে;
কখন সময় হবে।

হেমন্তে ঘাসে নীল ফুল ফোটে -
হৃদয় কেন যে কাঁপে,
“ভালোবাসতাম” - স্মৃতি - অঙ্গার - পাপে
তর্কিত কেন রয়েছে বর্তমান।
সে-ও কি আমায় -সুজাতা আমায় ভালোবেসে ফেলেছিল।
আজও ভালোবাসে না কি?
ইলেক্‌ট্রনেরা নিজ দোষগুণে বলয়িত হয়ে রবে;
কোনো অন্তিম ক্ষালিত আকাশে এর উত্তর হবে?

সুজাতা এখন ভুবনেশ্বরে;
অমিতা কি মিহিজামে?
বহুদিন থেকে ঠিকানা না জেনে ভালোই হয়েছে-সবই।
ঘাসের ভিতরে নীল শাদা ফুল ফোটে হেমন্তরাগে;
সময়ের এই স্থির এক দিক,
তবু স্থিরতর নয়;
প্রতিটি দিনের নতুন জীবাণু আবার স্থাপিত হয়। 


 আমাকে একটি কথা দাও

 - জীবনানন্দ দাশ

আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতো
সহজ মহৎ বিশাল,
গভীর; - সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভুকদের রক্তে
মলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন,
আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারীর।
সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাসের মতো:
সেই দিনের - আলোর অন্তহীন এঞ্জিন চঞ্চল ডানার মতন
সেই উজ্জ্বল পাখিনীর - পাখির সমস্ত পিপাসাকে যে
অগ্নির মতো প্রদীপ্ত দেখে অন্তিম শরীরিণী মোমের মতন।


 নির্জন স্বাক্ষর

  - জীবনানন্দ দাশ
 

তুমি তো জানো না কিছু - না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;
যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে -
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের 'পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষ'য়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের 'পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে?
আমি ঝ'রে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ'রে সেদিন পৃথিবীর 'পরে,
- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।


 কুড়ি বছর পরে

   - জীবনানন্দ দাশ

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি।
আবার বছর কুড়ি পরে–
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে কার্তিকের মাসে–
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে–তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়–মাঠের ভিতরে।

অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর;
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীরের থেকে খড় ছড়াতেছে;
মনিয়ার ঘরে রাত, শীত, আর শিশিরের জল।

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার–
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার।

হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু সরু কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের–আমের;
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার–
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার-আমার!

তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে–
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে।
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে–

সোনালি সোনালি চিল–শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে–
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে।


যাত্রী

   - জীবনানন্দ দাশ

 মনে হয় প্রাণ এক দূর স্বচ্ছ সাগরের কূলে
জন্ম নিয়েছিলো কবে;
পিছে মৃত্যুহীন জন্মহীন চিহ্নহীন
কুয়াশার যে ইঙ্গিত ছিলো --
সেই সব ধীরে ধীরে ভুলে গিয়ে অন্য এক মানে
পেয়েছিলো এখানে ভূমিষ্ঠ হয়ে -- আলো জল আকাশের টানে;
কেন যেন কাকে ভালোবেসে!




তবু 


   - জীবনানন্দ দাশ

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী
মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে
উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার
বছরে বয়সী আমি;
বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে
চলে যেতে দেখে - তবু - অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা ক’রে
এখানে তোমার কাছে দাঁড়ায়ে রয়েছি;
আজ ভোরে বাংলার তেরোশো চুয়ান্ন সাল এই
কোথাও নদীর জলে নিজেকে গণনা করে নিতে ভুলে গিয়ে
আগামী লোকের দিকে অগ্রসর হয়ে যায়; আমি
তবুও নিজেকে রোধ করে আজ থেমে যেতে চাই
তোমার জ্যোতির কাছে; আড়াই হাজার
বছর তা হলে আজ এইখানেই শেষ হয়ে গেছে।

নদীর জলের পথে মাছরাঙা ডানা বাড়াতেই
আলো ঠিকরায়ে গেছে -যারা পথে চলে যায় তাদের হৃদয়ে;
সৃষ্টির প্রথম আলোর কাছে; আহা,
অন্তিম আভার কাছে; জীবনের যতিহীন প্রগতিশীলতা
নিখিলের স্মরণীয় সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেছে; দেখ
পাখি চলে, তারা চলে, সূর্য মেঘে জ্বলে যায়, আমি
তবুও মধ্যম পথে দাঁড়ায়ে রয়েছি -তুমি দাঁড়াতে বলো নি।
আমাকে দেখ নি তুমি; দেখাবার মতো
অপব্যয়ী কল্পনার ইন্দ্রত্বের আসনে আমাকে
বসালে চকিত হয়ে দেখে যেতে যদি -তবু, সে আসনে আমি
যুগে যুগে সাময়িক শত্রুদের বসিয়েছি, নারি,
ভালোবেসে ধ্বংস হয়ে গ্যাছে তারা সব।
এ রকম অন্তহীন পটভূমিকায় - প্রেমে -
নতুন ঈশ্বরদের বারবার লুপ্ত হতে দেখে
আমারও হৃদয় থেকে তরুণতা হারিয়ে গিয়েছে;
অথচ নবীন তুমি।
নারি, তুমি সকালের জল উজ্জ্বলতা ছাড়া পৃথিবীর কোন নদীকেই
বিকেলে অপর ঢেউয়ে খরশান হতে
দিতে ভুলে গিয়েছিলে; রাতের প্রখর জলে নিয়তির দিকে
বহে যেতে দিতে মনে ছিলো কি তোমার?
এখনও কি মনে নেই?

আজ এই পৃথিবীর অন্ধকারে মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস
কেবলই শিথিল হয়ে যায়; তবু তুমি
সেই শিথিলতা নও, জানি, তবু ইতিহাসরীতিপ্রতিভার
মুখোমুখি আবছায়া দেয়ালের মতো নীল আকাশের দিকে
উর্ধ্বে উঠে যেতে চেয়ে তুমি
আমাদের দেশে কোনো তুমি বিশ্বাসের দীর্ঘ তরু নও।

তবু
কী যে উদয়ের সাগরের প্রতিবিম্ব জ্বলে ওঠে রোদ!
উদয় সমাপ্ত হয়ে গেছে নাকি সে অনেক আগে?
কোথাও বাতাস নেই, তবু
মর্মরিত হয়ে ওঠে উদয়ের সমুদ্রের পারে।
কোনো পাখি
কালের ফোকরে আজ নেই, তবু, নব সৃষ্টিমরালের মতো কলস্বরে
কেন কথা বলি; কোনো নারী
নেই, তবু আকাশহংসীর কণ্ঠে ভোরের সাগর উতরোল।


অন্য প্রেমিককে

 - জীবনানন্দ দাশ

মাছরাঙা চ'লে গেছে - আজ নয় কবেকার কথা;
তারপর বারবার ফিরে এসে দৃশ্যে উজ্জল।
দিতে চেয়ে মানুষের অবহেলা উপেক্ষায় হ'য়ে গেছে ক্ষয়;
বেদনা পেয়েছে তবু মানুষের নিজেরও হৃদয়
প্রকৃতির অনির্বচনীয় সব চিহ্ন থেকে দু' চোখ ফিরিয়ে;
বুদ্ধি আর লালসার সাধনাকে সব চেয়ে বড় ভেবে নিয়ে।

মাছরাঙা চ'লে গেছে --আজ নয় কবেকার কথা;
তারপর বারবার ফিরে এসে ডানাপালকের উজ্জলতা
ক্ষয় ক'রে তারপর হয়ে গেছে ক্ষয়।
মাছরাঙা মানুষের মতো সূর্য নয়?
কাজ করে কথা ব'লে চিন্তা করে চলেছে মানব;
যদিও সে শ্রেষ্ঠ চিন্তা সারাদিন চিন্তানাশা সাগরের জলে
ডুবে গিয়ে নিঃশব্দতা ছাড়া আর অন্য কিছু বলে?


 সে

  - জীবনানন্দ দাশ

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;
বলেছিলো: 'এ নদীর জল
তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল:
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এই নদী তুমি।'

'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?'
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।

সময়ের অবিরল শাদা আর কালো
বনানীর বুক থেকে এসে
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে
ঢের আগে নারী এক - তবু চোখ ঝলসানো আলো
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।


 সূর্য নক্ষত্র নারী

   - জীবনানন্দ দাশ

তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিল
সব চেয়ে আগে; জানি আমি।
সে দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই।
তুমি যে এ পৃথিবীতে রয়ে গেছ
আমাকে বলে নি কেউ।
কোথাও জলকে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জল
রয়ে গেছে -
যে যার নিজের কাজে আছে, এই অনুভবে চ’লে
শিয়রে নিয়ত স্ফীত সূর্যকে চেনে তারা;
আকাশের সপ্রতিভ নক্ষত্রকে চিনে উদীচীর
কোনো জল কী করে অপর জল চিনে নেবে অন্য নির্ঝরের?
তবুও জীবন ছুঁয়ে গেলে তুমি;
আমার চোখের থেকে নিমেষনিহত
সূর্যকে সরায়ে দিয়ে।

স’রে যেত; তবুও আয়ুর দিন ফুরোবার আগে
নব নব সূর্যকে নারীর বদলে
ছেড়ে দেয়? কেন দেব? সকল প্রতীতি উৎসবের
চেয়ে তবু বড় স্থিরতর প্রিয় তুমি; - নিঃসূর্য নির্জন
করে দিতে এলে।
মিলন ও বিদায়ের প্রয়োজনে আমি যদি মিলিত হতাম
তোমার উৎসের সাথে, তবে আমি অন্য সব প্রেমিকের মতো
বিরাট পৃথিবী আর সুবিশাল সময়কে সেবা করে আত্মস্থ হতাম।
তুমি তা জানো না, তবু, আমি জানি, একবার তোমাকে দেখেছি—
পিছনের পটভূমিকায় সময়ের
শেষনাগ ছিল, নেই -বিজ্ঞানের ক্লান্ত নক্ষত্রেরা
নিভে যায় -মানুষ অপরিজ্ঞাত সে অমায়; তবুও তাদের একজন
গভীর মানুষী কেন নিজেকে চেনায়!
আহা, তাকে অন্ধকার অনন্তের মতো আমি জেনে নিয়ে, তবু,
অল্পায়ু রঙিন রৌদ্রে মানবের ইতিহাসে কে না জেনে কোথায় চলেছি!

দুই
চারি দিকে সৃজনের অন্ধকার রয়ে গেছে, নারি,
অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালো
কোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালে
তোমার শরীর সব আলোকিত করে দিয়ে স্পষ্ট করে দেবে কোনো কালে
শরীরে যা রয়ে গেছে।
এইসব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে
নতুন সময় গ’ড়ে নিজেকে না গ’ড়ে তবু তুমি
ব্রহ্মাণ্ডের অন্ধকারে একবার জন্মাবার হেতু
অনুভব করেছিল -
জন্ম-জন্মান্তরের মৃত স্মরণের সাঁকো
তোমার হৃদয় স্পর্শ করে ব’লে আজ
আমাকে ইশারাপাত করে গেলে তারই; -
অপার কালের স্রোত না পেলে কী ক’রে তবু, নারি,
তুচ্ছ, খণ্ড, অল্প সময়ের স্বত্ব কাটায়ে অঋনী তোমাকে কাছে পাবে -
তোমার নিবিড় নিজ চোখ এসে নিজের বিষয় নিয়ে যাবে?
সময়ের কক্ষ থেকে দূর কক্ষে চাবি
খুলে ফেলে তুমি অন্য সব মেয়েদের
আত্মঅন্তরঙ্গতার দান
দেখায়ে অনঙ্ককাল ভেঙে গেলে পরে,
যে দেশে নক্ষত্র নেই—কোথাও সময় নেই আর -
আমারও হৃদয় নেই বিভা -
দেখাবে নিজের হাতে -অবশেষে -কী মকরকেতনে প্রতিভা।

তিন

তুমি আছ জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে অতীত আর
যেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম,
তাই শুধু কাটায়েছি।
কাটায়ে জেনেছি এই-ই শূন্য,তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোনো নাম।
অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো
দ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চলে যাওয়া।
শোককে স্বীকার ক’রে অবশেষে তবে
নিমেষের শরীরের উজ্জ্বলায় অনন্তের জ্ঞানপাপ মুছে দিতে হবে।
আজ এই ধ্বংসমত্ত অন্ধকার ভেদ ক’রে বিদ্যুতের মতো
তুমি যে শরীর নিয়ে রয়ে গেছ, সেই কথা সময়ের মনে
জানাবার আধার কি একজন পুরুষের নির্জন শরীরে
একটি পালক শুধু -হৃদয়বিহীন সব অপার আলোকবর্ষ আলোকবর্ষ ঘিরে?
অধঃপতিত এই অসময়ে কে-বা সেই উপচার পুরুষমানুষ?—
ভাবি আমি—জানি আমি, তবু
সে কথা আমাকে জানাবার
হৃদয় আমার নেই -
যে-কোনো প্রেমিক আজ এখন আমার
দেহের প্রতিভূ হয়ে নিজের নারীকে নিয়ে পৃথিবীর পথে
একটি মুহূর্তে যদি আমার অনন্ত হয় মহিলার জ্যোতিষ্কজগতে। 


 অবরোধ

   - জীবনানন্দ দাশ
  
বহুদিন আমার এ হৃদয়কে অবরোধ ক’রে রয়ে গেছে;
হেমন্তের স্তব্ধতায় পুনরায় করে অধিকার ।
কোথায় বিদেশে যেন
এক তিল অধিক প্রবীণ এক নীলিমার পারে
তাহাকে দেখিনি আমি ভালো ক’রে -তবু মহিলার
মনন-নিবিড় প্রাণ কখন আমার চোখঠারে
চোখ রেখে ব’লে গিয়েছিল :
‘সময়ের গ্রন্থি সনাতন, তবু সময়ও তা বেঁধে দিতে পারে?’

বিবর্ণ জড়িত এক ঘর;
কী ক’রে প্রাসাদ তাকে বলি আমি?
অনেক ফাটল নোনা আরসোলা কৃকলাস দেয়ালের ՚পর
ফ্রেমের ভিতরে ছবি খেয়ে ফেলে অনুরাধাপুর -ইলোরার;
মাতিসের -সেজানের - পিকাসোর;
অথবা কিসের ছবি? কিসের ছবির হাড়গোড়?

কেবল আধেক ছায়া -
ছায়ায় আশ্চর্য সব বৃত্তের পরিধি রয়ে গেছে ।
কেউ দেখে -কেউ তাহা দেখে নাকো -আমি দেখি নাই।
তবু তার অবলঙ কালো টেবিলের পাশে আধাআধি চাঁদনীর রাতে
‍মনে পড়ে আমিও বসেছি একদিন ।
কোথাকার মহিলা সে? কবেকার? -ভারতী নর্ডিক গ্রিক মুশ্লিম মার্কিন?
অথবা সময় তাকে শনাক্ত করে না আর;
সর্বদাই তাকে ঘিরে আধো-অন্ধকার;
চেয়ে থাকি -তবুও সে পৃথিবীর ভাষা ছেড়ে পরিভাষাহীন।
মনে পড়ে সেখানে উঠোনে এক দেবদারু গাছ ছিল।
তারপর সূর্যালোকে ফিরে এসে মনে হয় এইসব দেবদারু নয়।
সেই খানে তম্বুরার শব্দ ছিল ।
পৃথিবীতে দুন্দুভি বেজে ওঠে -বেজে ওঠে; সুর তান লয়
গান আছে পৃথিবীতে জানি, তবু গানের হৃদয় নেই।
একদিন রাত্রি এসে সকলের ঘুমের ভিতরে
আমাকে একাকী জেনে ডেকে নিল―অন্য এক ব্যবহারে
মাইলটাক দূরে পুরোপুরি।
সবি আছে -খুব কাছে; গোলকধাঁধার পথে ঘুরি
তবুও অনন্ত মাইল তারপর -কোথাও কিছুই নেই ব’লে।
অনেক আগের কথা এইসব -এই
সময় বৃত্তের মতো গোল ভেবে চুরুটের আস্ফোটে জানুহীন, মলিন সমাজ
সেই দিকে অগ্রসর হয় রোজ -একদিন সেই দেশ পাবে ।
সেই নারী নেই আর ভুলে তারা শতাব্দীর অন্ধকার ব্যসনে ফুরাবে ।



নির্জন স্বাক্ষর

  - জীবনানন্দ দাশ

 তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক'রে!
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! -
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!
আমি ঝরে যাব, তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!
রয়েছি সবুজ মাঠে - ঘাসে -
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে-আকাশে;
জীবনের রঙ তবু ফলানো কি হয়
এইসব ছুঁয়ে ছেনে!—সে এক বিস্ময়
পৃথিবীতে নাই তাহা - আকাশেও নাই তার স্থল -
চেনে নাই তারে অই সমুদ্রের জল!
রাতে রাতে হেঁটে হেঁটে নক্ষত্রের সনে
তারে আমি পাই নাই; কোনো এক মানুষীর মনে!
কোনো এক মানুষের তরে যে জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে!
নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দ আসনে
কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে!
একবার কথা ক’য়ে দেশ আর দিকের দেবতা
বোবা হয়ে পড়ে থাকে - ভুলে যায় কথা!
যে-আগুন উঠেছিল তাদের চোখের তলে জ্ব’লে
নিভে যায় - ডুবে যায় - তারা যায় স্খ’লে -
নতুন আকাঙ্খা আসে—চলে আসে নতুন সময়—
পুরানো সে নক্ষত্রের দিন শেষ হয়,
নতুনেরা আসিতেছে ব’লে! -
আমার বুকের থেকে তবুও কি পড়িয়াছে স্খলে
কোনো এক মানুষীর তরে
যেই প্রেম জ্বালায়েছি পুরোহিত হয়ে তার বুকের উপরে!
আমি সেই পুরোহিত -সেই পুরোহিত!—
যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত
লাগিতেছে আমার শরীরে -
যেই তারা জেগে আছে, তার দিকে ফিরে
তুমি আছো জেগে -
যে আকাশ জ্বলিতেছে, তার মতো মনের আবেগে
জেগে আছো -জানিয়াছো তুমি এক নিশ্চয়তা - হয়েছো নিশ্চয়!
হয়ে যায় আকাশের তলে কত আলো -কত আগুনের ক্ষয়;
কতবার বর্তমান হয়ে গেছে ব্যথিত অতীত -
তবুও তোমার বুকে লাগে নাই শীত
যে নক্ষত্র ঝরে যায় তার! যে পৃথিবী জেগে আছে, তার ঘাস -আকাশ তোমার!
জীবনের স্বাদ লয়ে জেগে আছো—তবুও মৃত্যুর ব্যথা দিতে
পার তুমি; তোমার আকাশে তুমি উষ্ণ হয়ে আছো, তবু -
বাহিরের আকাশের শীতে
নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়,
নক্ষত্রের মতন হৃদয়
পড়িতেছে ঝ’রে -
ক্লান্ত হয়ে -শিশিরের মতো শব্দ ক’রে!
জাননাকো তুমি তার স্বাদ,
তোমারে নিতেছে ডেকে জীবন অবাধ,
জীবন অগাধ!
হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন -
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে? - অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার আকাশ - আলো - জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!
আমি চলে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেই দিন পৃথিবীর ’পরে;—
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক'রে!


সিন্ধুসারস

   - জীবনানন্দ দাশ

 দু-এক মুহূর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে তুমি আর আমি
হে সিন্ধুসারস,
মালাবার পাহাড়ের কোল ছেড়ে অতি দূর তরঙ্গের জানালায় নামি
নাচিতেছ টারান্‌টেলা - রহস্যের ; আমি এই সমুদ্রের পারে চুপে থামি
চেয়ে দেখি বরফের মতো শাদা রৌদ্র, সবুজ ঘাসের মত প্রাণ
শৈলের গহ্বর থেকে অন্ধকার তরঙ্গেরে করিছে আহ্বান।

জানো কি অনেক যুগ চলে গেছে ? মরে গেছে অনেক নৃপতি ?
অনেক সোনার ধান ঝরে গেছে জানো না কি ? অনেক গহন ক্ষতি

আমাদের ক্লান্ত করে দিয়ে - হারায়েছি আনন্দের গতি;
ইচ্ছা, চিন্তা, স্বপ্ন, ব্যথা, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, এই বর্তমান
হৃদয়ে বিরস গান গাহিতেছে আমাদের—বেদনার আমরা সন্তান?
জানি পাখি, শাদা পাখি, মালাবার ফেনার সন্তান,
তুমি পিছে চাহো নাকো, তোমার অতীত নেই, স্মৃতি নেই,
বুকে নেই আকীর্ণ ধূসর
পাণ্ডুলিপি; পৃথিবীর পাখিদের মতো নেই শীতরাতে
ব্যথা আর কুয়াশার ঘর।
যে রক্ত ঝরেছে তারে স্বপ্নে বেঁধে কল্পনার নিঃসঙ্গ প্রভাত
নেই তব; নেই নিন্মভুমি- নেই আনন্দের অন্তরালে
প্রশ্ন আর চিন্তার আঘাত।
স্বপ্ন তুমি দেখ নি তো - পৃথিবীর সব পথ সব সিন্ধু ছেড়ে দিয়ে একা
বিপরীত দ্বীপে দূরে মায়াবীর আরশিতে হয় শুধু দেখা
রূপসীর সাথে এক ; সন্ধ্যার নদির ঢেউয়ে আসন্ন গল্পের মতো রেখা
প্রাণে তার - ম্লান চুল, চোখ তার হিজল বনের মতো কালো ;
একবার স্বপ্নে তারে দেখে ফেলে পৃথিবীর সব স্পষ্ট আলো
নিভে গেছে; যেখানে সোনার মধু ফুরায়েছে, করে না বুনন
মাছি আর ; হলুদ পাতার গন্ধে ভরে ওঠে অবিচল শালিকের মন
মেঘের দুপুর ভাসে - সোনালি চিলের বুক হয় উন্মন
মেঘের দুপুরে, আহা, ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে;
সেখানে আকাশে কেউ নেই আর, নেই আর পৃথিবীর ঘাসে।

তুমি সেই নিস্তব্ধতা চেনো নাকো; অথবা রক্তের পথে
পৃথিবীর ধূলির ভিতরে
জানো নাকো আজও কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্রী মাছির মতো ঝরে;
সৌন্দর্য রাখিছে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে;
গভীর নিলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের - ইন্দ্রধনু ধরিবার ক্লান্ত আয়োজন
হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।

এই সব জানোনাকো প্রবালপঞ্জর ঘিরে ডানার উল্লাসে;
রৌদ্রে ঝিলমিল করে শাদা ডানা, শাদা ফেনা-শিশুদের পাশে
হেলিওট্রোপের মতো দুপুরের অসীম আকাশে!
ঝিকমিক করে রৌদ্রে বরফের মতো শাদা ডানা,
যদিও এ পৃথিবীর স্বপ্ন চিন্তা সব তার অচেনা অজানা।

চঞ্চল শরের নীড়ে কবে তুমি - জন্ম তুমি নিয়েছিলে কবে,
বিষণ্ণ পৃথিবী ছেড়ে দলে দলে নেমেছিলে সবে
আরব সমুদ্রে, আর চীনের সাগরে -দূর ভারতের সিন্ধুর উৎসবে।
শীতার্ত এ পৃথিবীর আমরণ চেষ্টা ক্লান্তি বিহ্বলতা ছিঁড়ে
নেমেছিলে কবে নীল সমুদ্রের নীড়ে।

ধানের রসের গল্প পৃথিবীর - পৃথিবীর নরম অঘ্রান
পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই—আর তার প্রেমিকের ম্লান
নিঃসঙ্গ মুখের রুপ, বিশুস্ক তৃণের মতো প্রাণ,
জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না ; কলরব ক’রে উড়ে যায়
শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তিব্রতায়।