Wednesday, August 26, 2015

গরীব মানুষও মানুষ

পৃথিবীটা যদি শুধু ধণাঢ্যদের আবাসভূমি হত তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, ধরণীটা এত সুন্দরভাবে সাজানো থাকত না ধণীরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদেরকে পরিপাটি করিয়ে রাখতে পারে কিন্তু নিজেদের স্বক্ষমতায় পরিপাটি হওয়ার ক্ষমতা বা যোগ্যতা তাদের নেই । বরং অন্য গরীব মানুষদের অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়ে তাদের আরাম আয়েশের পারিপাশ্বিক সৗন্দর্য্য গড়ে উঠে ; বর্তমান বিশ্বের ধণীদের বিলাসী জীবন-যাপনে গরীবদের অবদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত।  একজন বিত্তশালীর  সকাল থেকে শুরু করে ঘুমুতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এমনকি ঘুমের সময়টাতেও সেবক-সেবিকার সাহায্য লাগে ধণের মাপকাঠিতে ধণাঢ্যদেরও আবার রকমফের আছে উচ্চ বিত্ত, মধ্য বিত্ত আবার কেউ উচ্চ-মধ্য বিত্তের সহ আরও কত কি স্রষ্টাও তার সৃষ্টিতে এমন বৈচিত্র্য দিয়েছেন যাতে মানুষের দ্বারাই মানুষ তার আরাম আয়েশের বিলাশী জীবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারে মাত্র থেকে ১০ শতাংশ মানুষের জন্য পৃথিবীর অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলছে কেননা জন্মগতভাবেই এমনভাবে সম্পদের বন্টন নির্ধারণ করা হয়েছে যার গন্ডী ছাপিয়ে নবযাত্রার সূচনা করা আদৌ সম্ভব হচ্ছে না বা সম্পদের বৈষম্য  বিদ্যমান থাকছে
এই সম্পদের বৈষম্যের কারণে বিত্তশালীরা আজ প্রভূর ভূমিকায় আর গরীবরা হয়ে যাচ্ছে তাদের গোলাম।বিত্তশালীদের বংশধরেরা উত্তরাধিকারী সূত্রেই পদবী বিত্তের মালিক হচ্ছে অন্যদিকে গরীবের সন্তান জন্ম নিয়েই বিত্তশালী প্রভূদের সেবা যত্ন করার জন্য সহজাত মানষিকতার প্রভাবিত বলয়ের মধ্যে বড় হতে হচ্ছে । সৃষ্টি হচ্ছে নতুন প্রভূ ভৃত্যের সম্পর্ক ।বিলাতি ধনীক শ্রেনী বৃটিশরা দেশ ছেড়ে যাবার সময় তাদের শুভ বুদ্ধির উদয়ের কারণে জমিদারী উচ্ছেদ করার আইন করে জমিদারী উচ্ছেদ করেছেলেন,প্রভূ ভৃত্যের ব্যবধানটা কমিয়ে আনার জন্য ।কিন্তু তা করেও শেষ রক্ষা হয়নি এই নব্য বিত্তশালীদের হাতে গরীবরা আজ গোরাম সম বন্ধী।যাহা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রতিবন্ধী করে রাখার নামান্তর।পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের আইন থাকা সত্বেও,সংবিধানে সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, ধনীর স্বার্থের অনুকূলে চলছে বাংলাদেশ ।স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে সেই বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের মতো বিত্তশালীর পক্ষে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গুলো অনুকূলে কাজ করে যায় নিরবধি। আর গরীবের ভাগ্য জোটে অযথা হয়রানী ও বঞ্চনা।রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে যুগ-যুগান্তর ধরে এমনভাবে ক্ষমতাধর ধনীদের অনুকূলে জী হুজুর মার্কা করা হয়েছে ।এখন  এই অশুভ অদৃশ্য শৃঙ্খল হতে গরীবদের মুক্ত হবার পথ রুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে ।কারণ পূর্বের দরিদ্র জনগণকে পড়িয়ে দেয়া শৃঙ্খলা থেকে বের হওয়ার পথ বর্তমানের ধনী ক্ষমতাবানেরা নতুন শৃঙ্খলিত শ্রেণী বিন্যাসের বৈসম্য সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থে সচেতন ভাবেই কাজ করেন,যেখানে গরীবের স্বার্থ স্বভাবজাত ভাবে অবহেলিত। তবুও কিছু ধনী বা ক্ষমতাবানের ব্যাতিক্রম উদাহরণ দেখলে আমরা খুশী হই,কিন্তু তা প্রয়োজনের তোলানায় অতি সামান্য অথবা সে ব্যতিক্রমের আড়ালে পরোক্ষ স্বাথের বিষয় টি লোকিয়ে থাকে।যেমন দান করা এমন একিটি বিষয় ডান হাত দান করলে বাম হাত যেনো জানতে না পারে ।কিন্তু ধনীদের দান গ্রহণ করতে গিয়ে গরীবদের প্রাণ যায় এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে ।ধনীরা কি তার দানটি গরীবদের ঘরে পৌঁছে দিতে পারে না । তা কিন্তু করা হয় না ।কারণ ধনীর প্রয়োজন লোকদের কাছে নিজেকে জাহির করা অথবা জনপ্রতিনিধি হবার জন্য এরকম দানের আয়োজন ।এতে মানুষের প্রাণ গেলেও ধনীদের মনে কোন বিকার লক্ষ করা যায় না।
স্রষ্টা মানুষের মধ্যে এমন কতগুলো মানদন্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন।যাতে প্রমাণ হয় মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।এখন এই মানুষকে যদি গরীব হওয়ার কারণে তাকে তার প্রাপ্য সহজাত জীবন ধারনের অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয় ,এজন্য গরীব আখ্যায়িত করে তাকে অবহেলা করা হয় ,তবে সেমানুষ সবচেয়ে অপরাধী আর এসমস্ত অপরাধীর কারণে দেশ হয় অভিশপ্ত যা পশ্চদপদতার নামান্তর।যা কোন মতেই কাম্য হতে পারে না এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, যারা মানুষের সম-মর্যাদার বৈষম্যের বিরোদ্ধে স্লোগান তুলে জনগণের মাঝে সাড়া ফেলেছিল পরে তারা কথা রাখেনি তাদের স্বার্থের কাছে নীতিবাক্য গুলো বাস্তবায়ন হয়নি বরং বানের জলের মতো ভেসে গিয়েছে  বিত্তশালীদের সীমানায় যেমন অর্থহীনের প্রবেশ নিষেধ তেমনি অর্থহীনদেরকে বৃত্তশালীরা মানুষ বলে বিবেচনা না করার মানসিকতাও দিন দিন বাড়ছে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীতে হয়ত দাস প্রথা পূণরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কখনও দেখা যাবে না, কিন্তু বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাস প্রথার সমতুল্য কিংবা আরও জঘন্য কিছু ঘৃণ্য প্রথার অনুশীলন করা হচ্ছে সমাজে মানুষ যদিও দিন দিন সভ্যতার নাগাল পেতে ছুঁটছে তবুও বর্বরতা থেকে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রতীয়মান  হচ্ছে না
গত শতাব্দীতে সাম্য দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের মধ্যে সৃষ্ট কৃত্রিম বিভেদ দেখে বলেছিলেন,
 দেখিনু সেদিন রেলে,
 কুলি লে এক বাবু সা তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে !
 চোখ ফেটে এল জল,
এমনি রে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে কি দুর্বল’ ?
তখনকার কবির অভিব্যক্তির সাথে বর্তমান বাস্তবতার খুব বেশি পার্থক্য হয়েছে বলে মনে হয় না শুধু স্থান কাল পাত্রের বদল হয়েছে মাত্র।আজো জনগণের প্রত্যাশিত দিন বদল হয়নি। দিনে দিনে মানুষের মধ্যে সম্পদের পার্থক্য যেমন বেড়েছে তেমনি বাড়ছে অমানবিকতা দূরত্ব কমার লক্ষণ অনুপস্থিত কারণ মানুষের মানবিক গুনাবলী ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং এরা যেন যান্ত্রিক যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে ,যেখানে মানবতা বলতে কিছু থাকছে না সর্বব্যাপী এখন কেবল ধণ আহরণ সঞ্চয়ের প্রতিযোগিতা চলছে যার ধণ আছে সে সমাজ রাষ্ট্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মর্যাদা পাচ্ছে  রাষ্ট্রের সুবিধা গুলো আপনাতেই অনুকূলে থাকছে এক্ষেত্রে ধণবানের পেশা কিংবা নীতি-নৈতিকতা কোন বাধার সৃষ্টি করছে না তাইতো কিছুটা বাস্তববাদীরা সাহস করেই উচ্চারণ করেছে, টাকাই দ্বীতিয় ঈশ্বর ধনীদের একটাই লক্ষ্য টাকা চাই, অঢেল টাকা টাকা আয়ের এই প্রতিযোগীতায় গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে।হচ্ছে বৈষম্যের শিকার ।
সম্মান ব্যক্তির নয় বরং পোশাকের-
ফার্সী ভাষার বিখ্যাত কবি শেখ সাদী রচিত বিখ্যাত গল্পটি হয়ত আমরা সকলেই জানি যেখানে অর্ন্তনিহিত গুণ নয় বাহ্যিক পোষাককে মূল্যায়ন করা হয়েছিল বর্তমানের বাস্তবতাও সেই গল্পের মতো, ব্যতিক্রম নয়
 ইসলাম ধর্মে মানুষের মধ্যে সাম্য ভ্রাতৃত্বের কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষিত হয়েছে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মানুষে মানুষে সাম্যতা ভ্রাতৃত্বের নজিড় স্থাপিত হয়েছিল ইসলামের সে বৈশিষ্ট্য দেখে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়া তলে আশ্রয় নিয়েছিল
ভালো কাজ/নিয়ম নীতি পৃথিবীতে দীর্ঘস্থায়ী থাকে না,কারণ মানুষের মনোবৃদ্ধি হলো নতুন বিচিত্র কোন কিছু অন্বেষণ করা,যদি তা নিষিদ্ধ ক্ষতিকারক হলেও তাতে মানুষ আকর্ষিত হয়।যেমন করে আদম হাওয়া বেহেস্তের সকল সুযোগ সুবিথা পাওয়া সত্ত্বেও গন্ধম ফলের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলেন মানবতার মুক্তির দুত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রচারিত ইসলামের বয়স মাত্র কয়েকশত বছর পার হতে না হতেই, ইবলিশ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য  মানুষের চরিত্রে স্থান পেতে চলেছে।মানুষের মনে ভোগের প্রবৃত্তির  জাগ্রত পশুত্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ বিবেককে ঘুম পড়িয়ে রাখতে সদা জাগ্রত যখন মানুষ মানুষকে অর্থের মানদন্ডে সম্মান দেখায়, তখন মানষ শুধু কষ্টের নদীকে আমন্ত্রন জানায়।আর এই ভেবে আত্মতৃপ্তি পায় যে,আমি অমুকের চেয়ে ভাল আছি ।আসলে কেউ ভালতে নেই।
ক্ষেত্রে বিশেষে যার অর্থ আছে তার কাছে গিয়ে সম্বলহীনকে মাথানত করাতে বাধ্য করা হয় এবং সে অর্থহীনকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয় বা তাকে সামান্য সম্মানটুকুও প্রদান করা হয় না সম্বলহীনের সাথে সম্পদশালীর আচার-ব্যবহার দেখলে যেন মনে হয় চতুষ্পদ পশুর সাথে তার রাখালীয় আচরণ করছে বিত্ত হলেই মানুষ ভূলে যায় তার সব দায়িত্ব ,মানবতাবোধ ও সমাজের প্রতিদায়িত্ব অর্থের অহংবোধ তার মনকে চঞ্চল করে প্রকৃত মানবতা হতে তার মনকে রুদ্ধ করে ফেলে। তখন আর গরীব অসহায় মানুষদেরকে মানুষ বলেই মূল্যায়িত করতে তার মন সায় দেয়না।বরং গরীবদের তার মুখাপেক্ষী বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয় । অথচ এই অসহায় গরীব মানুষগুলোই তাকে মহান পূরুষ বলে মনে করে।
মেথর, কুলি, মজুর, ঠেলাওয়ালা, রিকসাওয়ালা, তাঁতী, কামার, কুমোর, জেলে, মুচি, নাপিত, ধোঁপা, মিস্ত্রী, গৃহ-পরিচারিক, ড্রাইভার, হেলপার কিংবা সমজাতীয় পেশাজীবিদের সম্মান দিয়ে কতটুকু কথা বলা হয় ? সামাজিকভাবে এদের সম্মান কতটুকু ,ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কতোটুকু পায় তারা? কোন স্বার্থে কিংবা কার স্বার্থে এদের জন্য সমাজে সংকীর্ণ সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ? আদিম বর্বর যুগে দাস-দাসীদের সাথে যেরূপ আচরণ করা হত ;তার চেয়ে খুব ভালো আচরণ কি এই সভ্য যুগে এদের সাথে করা হচ্ছে ? মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব যোগ্যতা পেশাগত কারণে ক্ষণিকের জন্য কিছুটা পার্থক্য মেনে নেয়া যেতে পারে কিন্তু সে পার্থক্যকে স্থায়ী রূপ দেয়ার মানসিকতা হীন মানুষের পরিচায়ক নয় কি

প্রাচীন যুগের মহামতি দার্শনিক প্লেটো তার কল্পিত কল্যান রাষ্ট্রে সকল মানুষকে সম-মর্যাদা প্রদানের পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু তখন তা বাস্তবায়ণ সম্ভব হয়নি আজও হয়ত তা সম্ভব হবে না কিন্তু যতটুকু দরকার ততটুকু পরিবর্তন করার বাস্তবিক প্রচেষ্টা থাকা জরুরী সে পরিবর্তন আমাদেরকেই আনতে হবে এজন্য দরকার মানবিক গুনাবলির বিকাশের জন্য সঠিক চিন্তা ধারার অন্বেষণ যে সত্য অন্বেষণে ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব পূণঃপ্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে যেখানে রাজা-প্রজায় কোন ভেদাভেদ থাকবে না সবার প্রথম পরিচয় হবে মানুষ তারপর দরকার মানুষের মতো ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়া । শুধু সচেতনতার মানবিক আচরনের চর্চার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব প্রত্যেক ব্যক্তি প্রচেষ্টাতেই মানুষদের নব-দিগন্তের উম্মোচন হওয়া বাঞ্চনীয় কবির মত আমরাও যেন বলতে পারি,
আসিতেছে শুভ দিন,
 দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা
 শুধিতে হইবে ঋণ

তথ্যসূত্র: রাজু আহমেদের ব্লগ হতে সম্পাদিত ।


Wednesday, August 26, 2015

গরীব মানুষও মানুষ

পৃথিবীটা যদি শুধু ধণাঢ্যদের আবাসভূমি হত তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, ধরণীটা এত সুন্দরভাবে সাজানো থাকত না ধণীরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদেরকে পরিপাটি করিয়ে রাখতে পারে কিন্তু নিজেদের স্বক্ষমতায় পরিপাটি হওয়ার ক্ষমতা বা যোগ্যতা তাদের নেই । বরং অন্য গরীব মানুষদের অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়ে তাদের আরাম আয়েশের পারিপাশ্বিক সৗন্দর্য্য গড়ে উঠে ; বর্তমান বিশ্বের ধণীদের বিলাসী জীবন-যাপনে গরীবদের অবদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত।  একজন বিত্তশালীর  সকাল থেকে শুরু করে ঘুমুতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এমনকি ঘুমের সময়টাতেও সেবক-সেবিকার সাহায্য লাগে ধণের মাপকাঠিতে ধণাঢ্যদেরও আবার রকমফের আছে উচ্চ বিত্ত, মধ্য বিত্ত আবার কেউ উচ্চ-মধ্য বিত্তের সহ আরও কত কি স্রষ্টাও তার সৃষ্টিতে এমন বৈচিত্র্য দিয়েছেন যাতে মানুষের দ্বারাই মানুষ তার আরাম আয়েশের বিলাশী জীবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারে মাত্র থেকে ১০ শতাংশ মানুষের জন্য পৃথিবীর অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলছে কেননা জন্মগতভাবেই এমনভাবে সম্পদের বন্টন নির্ধারণ করা হয়েছে যার গন্ডী ছাপিয়ে নবযাত্রার সূচনা করা আদৌ সম্ভব হচ্ছে না বা সম্পদের বৈষম্য  বিদ্যমান থাকছে
এই সম্পদের বৈষম্যের কারণে বিত্তশালীরা আজ প্রভূর ভূমিকায় আর গরীবরা হয়ে যাচ্ছে তাদের গোলাম।বিত্তশালীদের বংশধরেরা উত্তরাধিকারী সূত্রেই পদবী বিত্তের মালিক হচ্ছে অন্যদিকে গরীবের সন্তান জন্ম নিয়েই বিত্তশালী প্রভূদের সেবা যত্ন করার জন্য সহজাত মানষিকতার প্রভাবিত বলয়ের মধ্যে বড় হতে হচ্ছে । সৃষ্টি হচ্ছে নতুন প্রভূ ভৃত্যের সম্পর্ক ।বিলাতি ধনীক শ্রেনী বৃটিশরা দেশ ছেড়ে যাবার সময় তাদের শুভ বুদ্ধির উদয়ের কারণে জমিদারী উচ্ছেদ করার আইন করে জমিদারী উচ্ছেদ করেছেলেন,প্রভূ ভৃত্যের ব্যবধানটা কমিয়ে আনার জন্য ।কিন্তু তা করেও শেষ রক্ষা হয়নি এই নব্য বিত্তশালীদের হাতে গরীবরা আজ গোরাম সম বন্ধী।যাহা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রতিবন্ধী করে রাখার নামান্তর।পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের আইন থাকা সত্বেও,সংবিধানে সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, ধনীর স্বার্থের অনুকূলে চলছে বাংলাদেশ ।স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে সেই বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের মতো বিত্তশালীর পক্ষে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গুলো অনুকূলে কাজ করে যায় নিরবধি। আর গরীবের ভাগ্য জোটে অযথা হয়রানী ও বঞ্চনা।রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে যুগ-যুগান্তর ধরে এমনভাবে ক্ষমতাধর ধনীদের অনুকূলে জী হুজুর মার্কা করা হয়েছে ।এখন  এই অশুভ অদৃশ্য শৃঙ্খল হতে গরীবদের মুক্ত হবার পথ রুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে ।কারণ পূর্বের দরিদ্র জনগণকে পড়িয়ে দেয়া শৃঙ্খলা থেকে বের হওয়ার পথ বর্তমানের ধনী ক্ষমতাবানেরা নতুন শৃঙ্খলিত শ্রেণী বিন্যাসের বৈসম্য সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থে সচেতন ভাবেই কাজ করেন,যেখানে গরীবের স্বার্থ স্বভাবজাত ভাবে অবহেলিত। তবুও কিছু ধনী বা ক্ষমতাবানের ব্যাতিক্রম উদাহরণ দেখলে আমরা খুশী হই,কিন্তু তা প্রয়োজনের তোলানায় অতি সামান্য অথবা সে ব্যতিক্রমের আড়ালে পরোক্ষ স্বাথের বিষয় টি লোকিয়ে থাকে।যেমন দান করা এমন একিটি বিষয় ডান হাত দান করলে বাম হাত যেনো জানতে না পারে ।কিন্তু ধনীদের দান গ্রহণ করতে গিয়ে গরীবদের প্রাণ যায় এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে ।ধনীরা কি তার দানটি গরীবদের ঘরে পৌঁছে দিতে পারে না । তা কিন্তু করা হয় না ।কারণ ধনীর প্রয়োজন লোকদের কাছে নিজেকে জাহির করা অথবা জনপ্রতিনিধি হবার জন্য এরকম দানের আয়োজন ।এতে মানুষের প্রাণ গেলেও ধনীদের মনে কোন বিকার লক্ষ করা যায় না।
স্রষ্টা মানুষের মধ্যে এমন কতগুলো মানদন্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন।যাতে প্রমাণ হয় মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।এখন এই মানুষকে যদি গরীব হওয়ার কারণে তাকে তার প্রাপ্য সহজাত জীবন ধারনের অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয় ,এজন্য গরীব আখ্যায়িত করে তাকে অবহেলা করা হয় ,তবে সেমানুষ সবচেয়ে অপরাধী আর এসমস্ত অপরাধীর কারণে দেশ হয় অভিশপ্ত যা পশ্চদপদতার নামান্তর।যা কোন মতেই কাম্য হতে পারে না এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, যারা মানুষের সম-মর্যাদার বৈষম্যের বিরোদ্ধে স্লোগান তুলে জনগণের মাঝে সাড়া ফেলেছিল পরে তারা কথা রাখেনি তাদের স্বার্থের কাছে নীতিবাক্য গুলো বাস্তবায়ন হয়নি বরং বানের জলের মতো ভেসে গিয়েছে  বিত্তশালীদের সীমানায় যেমন অর্থহীনের প্রবেশ নিষেধ তেমনি অর্থহীনদেরকে বৃত্তশালীরা মানুষ বলে বিবেচনা না করার মানসিকতাও দিন দিন বাড়ছে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীতে হয়ত দাস প্রথা পূণরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কখনও দেখা যাবে না, কিন্তু বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাস প্রথার সমতুল্য কিংবা আরও জঘন্য কিছু ঘৃণ্য প্রথার অনুশীলন করা হচ্ছে সমাজে মানুষ যদিও দিন দিন সভ্যতার নাগাল পেতে ছুঁটছে তবুও বর্বরতা থেকে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রতীয়মান  হচ্ছে না
গত শতাব্দীতে সাম্য দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের মধ্যে সৃষ্ট কৃত্রিম বিভেদ দেখে বলেছিলেন,
 দেখিনু সেদিন রেলে,
 কুলি লে এক বাবু সা তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে !
 চোখ ফেটে এল জল,
এমনি রে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে কি দুর্বল’ ?
তখনকার কবির অভিব্যক্তির সাথে বর্তমান বাস্তবতার খুব বেশি পার্থক্য হয়েছে বলে মনে হয় না শুধু স্থান কাল পাত্রের বদল হয়েছে মাত্র।আজো জনগণের প্রত্যাশিত দিন বদল হয়নি। দিনে দিনে মানুষের মধ্যে সম্পদের পার্থক্য যেমন বেড়েছে তেমনি বাড়ছে অমানবিকতা দূরত্ব কমার লক্ষণ অনুপস্থিত কারণ মানুষের মানবিক গুনাবলী ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং এরা যেন যান্ত্রিক যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে ,যেখানে মানবতা বলতে কিছু থাকছে না সর্বব্যাপী এখন কেবল ধণ আহরণ সঞ্চয়ের প্রতিযোগিতা চলছে যার ধণ আছে সে সমাজ রাষ্ট্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মর্যাদা পাচ্ছে  রাষ্ট্রের সুবিধা গুলো আপনাতেই অনুকূলে থাকছে এক্ষেত্রে ধণবানের পেশা কিংবা নীতি-নৈতিকতা কোন বাধার সৃষ্টি করছে না তাইতো কিছুটা বাস্তববাদীরা সাহস করেই উচ্চারণ করেছে, টাকাই দ্বীতিয় ঈশ্বর ধনীদের একটাই লক্ষ্য টাকা চাই, অঢেল টাকা টাকা আয়ের এই প্রতিযোগীতায় গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে।হচ্ছে বৈষম্যের শিকার ।
সম্মান ব্যক্তির নয় বরং পোশাকের-
ফার্সী ভাষার বিখ্যাত কবি শেখ সাদী রচিত বিখ্যাত গল্পটি হয়ত আমরা সকলেই জানি যেখানে অর্ন্তনিহিত গুণ নয় বাহ্যিক পোষাককে মূল্যায়ন করা হয়েছিল বর্তমানের বাস্তবতাও সেই গল্পের মতো, ব্যতিক্রম নয়
 ইসলাম ধর্মে মানুষের মধ্যে সাম্য ভ্রাতৃত্বের কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষিত হয়েছে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মানুষে মানুষে সাম্যতা ভ্রাতৃত্বের নজিড় স্থাপিত হয়েছিল ইসলামের সে বৈশিষ্ট্য দেখে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়া তলে আশ্রয় নিয়েছিল
ভালো কাজ/নিয়ম নীতি পৃথিবীতে দীর্ঘস্থায়ী থাকে না,কারণ মানুষের মনোবৃদ্ধি হলো নতুন বিচিত্র কোন কিছু অন্বেষণ করা,যদি তা নিষিদ্ধ ক্ষতিকারক হলেও তাতে মানুষ আকর্ষিত হয়।যেমন করে আদম হাওয়া বেহেস্তের সকল সুযোগ সুবিথা পাওয়া সত্ত্বেও গন্ধম ফলের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলেন মানবতার মুক্তির দুত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রচারিত ইসলামের বয়স মাত্র কয়েকশত বছর পার হতে না হতেই, ইবলিশ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য  মানুষের চরিত্রে স্থান পেতে চলেছে।মানুষের মনে ভোগের প্রবৃত্তির  জাগ্রত পশুত্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ বিবেককে ঘুম পড়িয়ে রাখতে সদা জাগ্রত যখন মানুষ মানুষকে অর্থের মানদন্ডে সম্মান দেখায়, তখন মানষ শুধু কষ্টের নদীকে আমন্ত্রন জানায়।আর এই ভেবে আত্মতৃপ্তি পায় যে,আমি অমুকের চেয়ে ভাল আছি ।আসলে কেউ ভালতে নেই।
ক্ষেত্রে বিশেষে যার অর্থ আছে তার কাছে গিয়ে সম্বলহীনকে মাথানত করাতে বাধ্য করা হয় এবং সে অর্থহীনকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয় বা তাকে সামান্য সম্মানটুকুও প্রদান করা হয় না সম্বলহীনের সাথে সম্পদশালীর আচার-ব্যবহার দেখলে যেন মনে হয় চতুষ্পদ পশুর সাথে তার রাখালীয় আচরণ করছে বিত্ত হলেই মানুষ ভূলে যায় তার সব দায়িত্ব ,মানবতাবোধ ও সমাজের প্রতিদায়িত্ব অর্থের অহংবোধ তার মনকে চঞ্চল করে প্রকৃত মানবতা হতে তার মনকে রুদ্ধ করে ফেলে। তখন আর গরীব অসহায় মানুষদেরকে মানুষ বলেই মূল্যায়িত করতে তার মন সায় দেয়না।বরং গরীবদের তার মুখাপেক্ষী বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয় । অথচ এই অসহায় গরীব মানুষগুলোই তাকে মহান পূরুষ বলে মনে করে।
মেথর, কুলি, মজুর, ঠেলাওয়ালা, রিকসাওয়ালা, তাঁতী, কামার, কুমোর, জেলে, মুচি, নাপিত, ধোঁপা, মিস্ত্রী, গৃহ-পরিচারিক, ড্রাইভার, হেলপার কিংবা সমজাতীয় পেশাজীবিদের সম্মান দিয়ে কতটুকু কথা বলা হয় ? সামাজিকভাবে এদের সম্মান কতটুকু ,ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কতোটুকু পায় তারা? কোন স্বার্থে কিংবা কার স্বার্থে এদের জন্য সমাজে সংকীর্ণ সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ? আদিম বর্বর যুগে দাস-দাসীদের সাথে যেরূপ আচরণ করা হত ;তার চেয়ে খুব ভালো আচরণ কি এই সভ্য যুগে এদের সাথে করা হচ্ছে ? মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব যোগ্যতা পেশাগত কারণে ক্ষণিকের জন্য কিছুটা পার্থক্য মেনে নেয়া যেতে পারে কিন্তু সে পার্থক্যকে স্থায়ী রূপ দেয়ার মানসিকতা হীন মানুষের পরিচায়ক নয় কি

প্রাচীন যুগের মহামতি দার্শনিক প্লেটো তার কল্পিত কল্যান রাষ্ট্রে সকল মানুষকে সম-মর্যাদা প্রদানের পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু তখন তা বাস্তবায়ণ সম্ভব হয়নি আজও হয়ত তা সম্ভব হবে না কিন্তু যতটুকু দরকার ততটুকু পরিবর্তন করার বাস্তবিক প্রচেষ্টা থাকা জরুরী সে পরিবর্তন আমাদেরকেই আনতে হবে এজন্য দরকার মানবিক গুনাবলির বিকাশের জন্য সঠিক চিন্তা ধারার অন্বেষণ যে সত্য অন্বেষণে ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব পূণঃপ্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে যেখানে রাজা-প্রজায় কোন ভেদাভেদ থাকবে না সবার প্রথম পরিচয় হবে মানুষ তারপর দরকার মানুষের মতো ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়া । শুধু সচেতনতার মানবিক আচরনের চর্চার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব প্রত্যেক ব্যক্তি প্রচেষ্টাতেই মানুষদের নব-দিগন্তের উম্মোচন হওয়া বাঞ্চনীয় কবির মত আমরাও যেন বলতে পারি,
আসিতেছে শুভ দিন,
 দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা
 শুধিতে হইবে ঋণ

তথ্যসূত্র: রাজু আহমেদের ব্লগ হতে সম্পাদিত ।