Showing posts with label History ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label History ইতিহাস. Show all posts

Tuesday, October 18, 2016

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য নীতি কি ?চাণক্য কে ছিলেন, তিনি কি করতেন বা কেন তিনি এত নামীদামী ব্যক্তি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। অন্তত “ভারত চাণক্য নীতিতে চলে” বা “ভারতের পররাষ্ট্রনীতি চাণক্যকে অনুসরণ করে”- এই কথা আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখে অনেকবার শুনেছি। চানক্য আসলে কে বা কি তা এই প্রবন্ধ পড়লে আশা করি আপনার কাছে পরিষ্কার হবে।
চাণক্য (কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত) একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং ‘অর্থশাস্ত্র নামক’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।

চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চাণক্য ছিলেন একাধারে আমাদের এই উপমহাদেশের একজন নামকরা অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষক। অপরদিকে তিনি ছিলেন মৌর্য রাজের প্রধানমন্ত্রীও। আজ থেকে প্রায় তেইশ শত বছর আগে উনি তার শিক্ষাদান ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এই ভূমিতে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও বসবাস করতেন শ্মশানে; দেশীয় রাজদের বিদেশীদের হাত থেকে নিজ ভূমি উদ্ধারে উৎসাহ দিতেন, নিজে সামনে থেকে লড়তেন।
আবার উনি ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন; ওনাকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামে ডাকা হয়। আজ আমরা যারা ব্লগে, অথবা ফেসবুকে ছদ্মনামে লিখি, উনাকে তাদের গুরু বলা যেতে পারে। ক্ষমাসীনদের রক্তচক্ষু ও খড়গ হস্ত এড়ানোর জন্য ইন্টারনেটে ছদ্মনামে আজ যেসমস্ত উচিৎ কথার লেখালেখি হয়, তা উনি শুরু করেছিলেন সেই দুইহাজার তিনশত বছর আগে আজ তা আমরা করছি। নিশ্চয় আজকের মত তখনও তার কল্লা খুঁজে বেড়ানো হতো। এবং সেকালে গুমের সংস্কৃতি বা জেল জরিমানার প্রচলণ না থাকলেও ক্ষমতাধর রাজাদের যথাজ্ঞা পালন করার মানুষের অভাব ছিল না ?যেমনটি চলছে বর্তমানে ।
সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
চাণক্য কাহিনী
ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রাচীন পণ্ডিত অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন চাণক্য। এ উপমহাদেশ তো বটেই গোটা প্রাচ্যেই তাকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বাস্তববাদী পণ্ডিত মনে করা হয়। মহাকবি কালিদাস যুগেরও অনেক আগে আবির্ভূত এই পণ্ডিত তার সময়ে থেকেই ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন। লিখে গেছেন অমর সব তত্ত্বগাঁথা। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০- খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩) ছিলেন প্রাচীন ভারতের পণ্ডিত, দার্শনিক ও রাজ উপদেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিহারের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ ছিলেন। মৌর্য রাজবংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজক্ষমতা অর্জন ও মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি চন্দ্রগুপ্ত ও পরবর্তীতে তার ছেলে বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ উপদেষ্টা ছিলেন। দার্শনিক প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটির জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়, যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবচর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। মহাজ্ঞানী চাণক্যের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বিষ্ণুগুপ্ত। এ ছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য'। কৌটিল্য নামেই তিনি সংস্কৃত ভাষার অমর গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' লিখে গেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা শাস্ত্র মানা হয়। যেহেতু তিনি 'কুটিলা গোত্র' থেকে উদ্ভূত ছিলেন তাই সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি 'কৌটিল্য' ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তার সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় নাম 'চাণক্য'-এর উদ্ভব 'চানকা' থেকে। চানকা হচ্ছে তার গ্রামের নাম। এই গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মতান্তরে পিতার নাম 'চানক' থেকে 'চাণক্য পণ্ডিত' হিসেবে সর্বত্র পরিচিত হয়ে উঠেন চাণক্য।
চাণক্য কী পরিমাণ জ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন তার শাস্ত্র পড়লেই সে সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, দার্শনিক, শাসক এবং কূটনীতিক ছিলেন। তার সমাজ ও জীবন সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো আজকের আধুনিক জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা। তার 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে তিনি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে ওঠে এবং পরিণতি লাভ করে। তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে একজন শাসককে নিজস্ব ভূখণ্ডের সীমানা পেরিয়ে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হয়। একইভাবে সম্পদ ও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নত করার জন্য কী কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে সেসব বিষয়ও পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করেন চাণক্য। তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি নামে অর্থশাস্ত্র হলেও এটি মূলত শাসকের উদ্দেশে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিবিষয়ক কৌশলের পরামর্শ। আর তৎকালীন সময়ের রাজা-মহারাজারা তাদের রাজদরবারে এ রকম একজন-দুজন পণ্ডিতকে সবসময়ই প্রাধান্য দিতেন। কাজেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এসব পণ্ডিতদের দারুণ ভূমিকা ছিল। সে অর্থে বলা যেতেই পারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পরবর্তীকালের রাজাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনকল্যাণমূলক রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে সমর্থ হয়েছিল। এর প্রমাণ পরবর্তী সময়ের প্রজাবৎসল শাসকদের রাজ্য শাসন ও রাজ্য পরিচালনা নীতি। স্পষ্টতই তাদের সে সময়ের শাসনে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বড় একটি ছাপ পড়েছে। চাণক্য-সহায়তায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের চবি্বশ বছরের শাসনকালের পরও দ্বিতীয় প্রজন্ম বিন্দুসারার সমৃদ্ধিময় জনপ্রিয়তা যাচাই করে। শুধু কী তারও পরে আরও পরিশীলিত আকারে কৌটিল্যের নীতির প্রভাব পড়ে ভারতবর্ষের শাসনকার্যে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মৌর্য বংশের তৃতীয় শাসক সম্রাট অশোকের শাসন। এই সময়টি এতটাই পরিশীলিত ছিল যে বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামেও প্রাচীন ও গভীর ঐতিহ্যবাহী অশোক-স্তম্ভের উপস্থিতি রয়ে গেছে। এমনকি পরবর্তীতে বিক্রমাদিত্যের শাসনকালের কিংবদন্তীয় উপকথাগুলোর জনপ্রিয় লোকভাষ্য থেকেও তা ধারণা করা যায় হয় তো। এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। তার এসব নীতি বেশকিছু বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এগুলোর ওই অর্থে প্রাচীন লিখিত রূপ না থাকলেও বিচ্ছিন্ন সব তত্ত্ব নিয়ে সংকলণ ঠিকই বেরিয়েছে। এ ধরনের একটি সংকলনের নাম 'চাণক্য নীতি দর্পণ'। তার কথাগুলো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন হলেও আজকের দিনে ঠিক একই তাৎপর্য বহন করে। চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, 'বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারও থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী-এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।' তিনি আরও বলেছেন- 'মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এ বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।' এমন দুটো কথা থেকেই অনুধাবন করা যায় জীবন সম্পর্কে চাণক্যের উপলব্ধি কতটা গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

চাণক্যের অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দবংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। এ পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্রগুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্রগুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে। চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পণ্ডিত হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় একটি অবস্থান ধরে রেখেছেন। টিকে আছেন তার কর্মবহুল জীবনের কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞানদান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ রকম জ্ঞানী একটি মানুষ কিন্তু শারীরিকভাবে খুব একটা সবল ছিলেন না। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিতের সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিকথাগুলো হাজার বছর পরও গুরুত্ব হারায়নি। আজো তা 'চাণক্য-শ্লোক' নামে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমরা প্রতিদিন কথার ফাঁকে এমন অনেক উক্তিই আওড়াই যেগুলো কার সেটি-ই হয়তো আমরা জানি না।.
Showing posts with label History ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label History ইতিহাস. Show all posts

Tuesday, October 18, 2016

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য নীতি কি ?চাণক্য কে ছিলেন, তিনি কি করতেন বা কেন তিনি এত নামীদামী ব্যক্তি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। অন্তত “ভারত চাণক্য নীতিতে চলে” বা “ভারতের পররাষ্ট্রনীতি চাণক্যকে অনুসরণ করে”- এই কথা আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখে অনেকবার শুনেছি। চানক্য আসলে কে বা কি তা এই প্রবন্ধ পড়লে আশা করি আপনার কাছে পরিষ্কার হবে।
চাণক্য (কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত) একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং ‘অর্থশাস্ত্র নামক’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।

চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চাণক্য ছিলেন একাধারে আমাদের এই উপমহাদেশের একজন নামকরা অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষক। অপরদিকে তিনি ছিলেন মৌর্য রাজের প্রধানমন্ত্রীও। আজ থেকে প্রায় তেইশ শত বছর আগে উনি তার শিক্ষাদান ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এই ভূমিতে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও বসবাস করতেন শ্মশানে; দেশীয় রাজদের বিদেশীদের হাত থেকে নিজ ভূমি উদ্ধারে উৎসাহ দিতেন, নিজে সামনে থেকে লড়তেন।
আবার উনি ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন; ওনাকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামে ডাকা হয়। আজ আমরা যারা ব্লগে, অথবা ফেসবুকে ছদ্মনামে লিখি, উনাকে তাদের গুরু বলা যেতে পারে। ক্ষমাসীনদের রক্তচক্ষু ও খড়গ হস্ত এড়ানোর জন্য ইন্টারনেটে ছদ্মনামে আজ যেসমস্ত উচিৎ কথার লেখালেখি হয়, তা উনি শুরু করেছিলেন সেই দুইহাজার তিনশত বছর আগে আজ তা আমরা করছি। নিশ্চয় আজকের মত তখনও তার কল্লা খুঁজে বেড়ানো হতো। এবং সেকালে গুমের সংস্কৃতি বা জেল জরিমানার প্রচলণ না থাকলেও ক্ষমতাধর রাজাদের যথাজ্ঞা পালন করার মানুষের অভাব ছিল না ?যেমনটি চলছে বর্তমানে ।
সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
চাণক্য কাহিনী
ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রাচীন পণ্ডিত অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন চাণক্য। এ উপমহাদেশ তো বটেই গোটা প্রাচ্যেই তাকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বাস্তববাদী পণ্ডিত মনে করা হয়। মহাকবি কালিদাস যুগেরও অনেক আগে আবির্ভূত এই পণ্ডিত তার সময়ে থেকেই ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন। লিখে গেছেন অমর সব তত্ত্বগাঁথা। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০- খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩) ছিলেন প্রাচীন ভারতের পণ্ডিত, দার্শনিক ও রাজ উপদেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিহারের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ ছিলেন। মৌর্য রাজবংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজক্ষমতা অর্জন ও মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি চন্দ্রগুপ্ত ও পরবর্তীতে তার ছেলে বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ উপদেষ্টা ছিলেন। দার্শনিক প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটির জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়, যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবচর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। মহাজ্ঞানী চাণক্যের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বিষ্ণুগুপ্ত। এ ছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য'। কৌটিল্য নামেই তিনি সংস্কৃত ভাষার অমর গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' লিখে গেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা শাস্ত্র মানা হয়। যেহেতু তিনি 'কুটিলা গোত্র' থেকে উদ্ভূত ছিলেন তাই সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি 'কৌটিল্য' ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তার সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় নাম 'চাণক্য'-এর উদ্ভব 'চানকা' থেকে। চানকা হচ্ছে তার গ্রামের নাম। এই গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মতান্তরে পিতার নাম 'চানক' থেকে 'চাণক্য পণ্ডিত' হিসেবে সর্বত্র পরিচিত হয়ে উঠেন চাণক্য।
চাণক্য কী পরিমাণ জ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন তার শাস্ত্র পড়লেই সে সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, দার্শনিক, শাসক এবং কূটনীতিক ছিলেন। তার সমাজ ও জীবন সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো আজকের আধুনিক জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা। তার 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে তিনি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে ওঠে এবং পরিণতি লাভ করে। তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে একজন শাসককে নিজস্ব ভূখণ্ডের সীমানা পেরিয়ে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হয়। একইভাবে সম্পদ ও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নত করার জন্য কী কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে সেসব বিষয়ও পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করেন চাণক্য। তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি নামে অর্থশাস্ত্র হলেও এটি মূলত শাসকের উদ্দেশে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিবিষয়ক কৌশলের পরামর্শ। আর তৎকালীন সময়ের রাজা-মহারাজারা তাদের রাজদরবারে এ রকম একজন-দুজন পণ্ডিতকে সবসময়ই প্রাধান্য দিতেন। কাজেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এসব পণ্ডিতদের দারুণ ভূমিকা ছিল। সে অর্থে বলা যেতেই পারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পরবর্তীকালের রাজাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনকল্যাণমূলক রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে সমর্থ হয়েছিল। এর প্রমাণ পরবর্তী সময়ের প্রজাবৎসল শাসকদের রাজ্য শাসন ও রাজ্য পরিচালনা নীতি। স্পষ্টতই তাদের সে সময়ের শাসনে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বড় একটি ছাপ পড়েছে। চাণক্য-সহায়তায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের চবি্বশ বছরের শাসনকালের পরও দ্বিতীয় প্রজন্ম বিন্দুসারার সমৃদ্ধিময় জনপ্রিয়তা যাচাই করে। শুধু কী তারও পরে আরও পরিশীলিত আকারে কৌটিল্যের নীতির প্রভাব পড়ে ভারতবর্ষের শাসনকার্যে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মৌর্য বংশের তৃতীয় শাসক সম্রাট অশোকের শাসন। এই সময়টি এতটাই পরিশীলিত ছিল যে বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামেও প্রাচীন ও গভীর ঐতিহ্যবাহী অশোক-স্তম্ভের উপস্থিতি রয়ে গেছে। এমনকি পরবর্তীতে বিক্রমাদিত্যের শাসনকালের কিংবদন্তীয় উপকথাগুলোর জনপ্রিয় লোকভাষ্য থেকেও তা ধারণা করা যায় হয় তো। এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। তার এসব নীতি বেশকিছু বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এগুলোর ওই অর্থে প্রাচীন লিখিত রূপ না থাকলেও বিচ্ছিন্ন সব তত্ত্ব নিয়ে সংকলণ ঠিকই বেরিয়েছে। এ ধরনের একটি সংকলনের নাম 'চাণক্য নীতি দর্পণ'। তার কথাগুলো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন হলেও আজকের দিনে ঠিক একই তাৎপর্য বহন করে। চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, 'বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারও থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী-এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।' তিনি আরও বলেছেন- 'মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এ বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।' এমন দুটো কথা থেকেই অনুধাবন করা যায় জীবন সম্পর্কে চাণক্যের উপলব্ধি কতটা গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

চাণক্যের অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দবংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। এ পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্রগুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্রগুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে। চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পণ্ডিত হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় একটি অবস্থান ধরে রেখেছেন। টিকে আছেন তার কর্মবহুল জীবনের কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞানদান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ রকম জ্ঞানী একটি মানুষ কিন্তু শারীরিকভাবে খুব একটা সবল ছিলেন না। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিতের সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিকথাগুলো হাজার বছর পরও গুরুত্ব হারায়নি। আজো তা 'চাণক্য-শ্লোক' নামে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমরা প্রতিদিন কথার ফাঁকে এমন অনেক উক্তিই আওড়াই যেগুলো কার সেটি-ই হয়তো আমরা জানি না।.