Tuesday, October 18, 2016

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য নীতি কি ?চাণক্য কে ছিলেন, তিনি কি করতেন বা কেন তিনি এত নামীদামী ব্যক্তি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। অন্তত “ভারত চাণক্য নীতিতে চলে” বা “ভারতের পররাষ্ট্রনীতি চাণক্যকে অনুসরণ করে”- এই কথা আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখে অনেকবার শুনেছি। চানক্য আসলে কে বা কি তা এই প্রবন্ধ পড়লে আশা করি আপনার কাছে পরিষ্কার হবে।
চাণক্য (কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত) একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং ‘অর্থশাস্ত্র নামক’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।

চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চাণক্য ছিলেন একাধারে আমাদের এই উপমহাদেশের একজন নামকরা অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষক। অপরদিকে তিনি ছিলেন মৌর্য রাজের প্রধানমন্ত্রীও। আজ থেকে প্রায় তেইশ শত বছর আগে উনি তার শিক্ষাদান ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এই ভূমিতে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও বসবাস করতেন শ্মশানে; দেশীয় রাজদের বিদেশীদের হাত থেকে নিজ ভূমি উদ্ধারে উৎসাহ দিতেন, নিজে সামনে থেকে লড়তেন।
আবার উনি ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন; ওনাকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামে ডাকা হয়। আজ আমরা যারা ব্লগে, অথবা ফেসবুকে ছদ্মনামে লিখি, উনাকে তাদের গুরু বলা যেতে পারে। ক্ষমাসীনদের রক্তচক্ষু ও খড়গ হস্ত এড়ানোর জন্য ইন্টারনেটে ছদ্মনামে আজ যেসমস্ত উচিৎ কথার লেখালেখি হয়, তা উনি শুরু করেছিলেন সেই দুইহাজার তিনশত বছর আগে আজ তা আমরা করছি। নিশ্চয় আজকের মত তখনও তার কল্লা খুঁজে বেড়ানো হতো। এবং সেকালে গুমের সংস্কৃতি বা জেল জরিমানার প্রচলণ না থাকলেও ক্ষমতাধর রাজাদের যথাজ্ঞা পালন করার মানুষের অভাব ছিল না ?যেমনটি চলছে বর্তমানে ।
সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
চাণক্য কাহিনী
ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রাচীন পণ্ডিত অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন চাণক্য। এ উপমহাদেশ তো বটেই গোটা প্রাচ্যেই তাকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বাস্তববাদী পণ্ডিত মনে করা হয়। মহাকবি কালিদাস যুগেরও অনেক আগে আবির্ভূত এই পণ্ডিত তার সময়ে থেকেই ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন। লিখে গেছেন অমর সব তত্ত্বগাঁথা। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০- খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩) ছিলেন প্রাচীন ভারতের পণ্ডিত, দার্শনিক ও রাজ উপদেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিহারের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ ছিলেন। মৌর্য রাজবংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজক্ষমতা অর্জন ও মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি চন্দ্রগুপ্ত ও পরবর্তীতে তার ছেলে বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ উপদেষ্টা ছিলেন। দার্শনিক প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটির জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়, যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবচর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। মহাজ্ঞানী চাণক্যের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বিষ্ণুগুপ্ত। এ ছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য'। কৌটিল্য নামেই তিনি সংস্কৃত ভাষার অমর গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' লিখে গেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা শাস্ত্র মানা হয়। যেহেতু তিনি 'কুটিলা গোত্র' থেকে উদ্ভূত ছিলেন তাই সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি 'কৌটিল্য' ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তার সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় নাম 'চাণক্য'-এর উদ্ভব 'চানকা' থেকে। চানকা হচ্ছে তার গ্রামের নাম। এই গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মতান্তরে পিতার নাম 'চানক' থেকে 'চাণক্য পণ্ডিত' হিসেবে সর্বত্র পরিচিত হয়ে উঠেন চাণক্য।
চাণক্য কী পরিমাণ জ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন তার শাস্ত্র পড়লেই সে সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, দার্শনিক, শাসক এবং কূটনীতিক ছিলেন। তার সমাজ ও জীবন সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো আজকের আধুনিক জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা। তার 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে তিনি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে ওঠে এবং পরিণতি লাভ করে। তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে একজন শাসককে নিজস্ব ভূখণ্ডের সীমানা পেরিয়ে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হয়। একইভাবে সম্পদ ও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নত করার জন্য কী কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে সেসব বিষয়ও পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করেন চাণক্য। তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি নামে অর্থশাস্ত্র হলেও এটি মূলত শাসকের উদ্দেশে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিবিষয়ক কৌশলের পরামর্শ। আর তৎকালীন সময়ের রাজা-মহারাজারা তাদের রাজদরবারে এ রকম একজন-দুজন পণ্ডিতকে সবসময়ই প্রাধান্য দিতেন। কাজেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এসব পণ্ডিতদের দারুণ ভূমিকা ছিল। সে অর্থে বলা যেতেই পারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পরবর্তীকালের রাজাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনকল্যাণমূলক রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে সমর্থ হয়েছিল। এর প্রমাণ পরবর্তী সময়ের প্রজাবৎসল শাসকদের রাজ্য শাসন ও রাজ্য পরিচালনা নীতি। স্পষ্টতই তাদের সে সময়ের শাসনে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বড় একটি ছাপ পড়েছে। চাণক্য-সহায়তায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের চবি্বশ বছরের শাসনকালের পরও দ্বিতীয় প্রজন্ম বিন্দুসারার সমৃদ্ধিময় জনপ্রিয়তা যাচাই করে। শুধু কী তারও পরে আরও পরিশীলিত আকারে কৌটিল্যের নীতির প্রভাব পড়ে ভারতবর্ষের শাসনকার্যে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মৌর্য বংশের তৃতীয় শাসক সম্রাট অশোকের শাসন। এই সময়টি এতটাই পরিশীলিত ছিল যে বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামেও প্রাচীন ও গভীর ঐতিহ্যবাহী অশোক-স্তম্ভের উপস্থিতি রয়ে গেছে। এমনকি পরবর্তীতে বিক্রমাদিত্যের শাসনকালের কিংবদন্তীয় উপকথাগুলোর জনপ্রিয় লোকভাষ্য থেকেও তা ধারণা করা যায় হয় তো। এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। তার এসব নীতি বেশকিছু বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এগুলোর ওই অর্থে প্রাচীন লিখিত রূপ না থাকলেও বিচ্ছিন্ন সব তত্ত্ব নিয়ে সংকলণ ঠিকই বেরিয়েছে। এ ধরনের একটি সংকলনের নাম 'চাণক্য নীতি দর্পণ'। তার কথাগুলো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন হলেও আজকের দিনে ঠিক একই তাৎপর্য বহন করে। চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, 'বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারও থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী-এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।' তিনি আরও বলেছেন- 'মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এ বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।' এমন দুটো কথা থেকেই অনুধাবন করা যায় জীবন সম্পর্কে চাণক্যের উপলব্ধি কতটা গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

চাণক্যের অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দবংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। এ পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্রগুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্রগুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে। চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পণ্ডিত হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় একটি অবস্থান ধরে রেখেছেন। টিকে আছেন তার কর্মবহুল জীবনের কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞানদান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ রকম জ্ঞানী একটি মানুষ কিন্তু শারীরিকভাবে খুব একটা সবল ছিলেন না। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিতের সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিকথাগুলো হাজার বছর পরও গুরুত্ব হারায়নি। আজো তা 'চাণক্য-শ্লোক' নামে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমরা প্রতিদিন কথার ফাঁকে এমন অনেক উক্তিই আওড়াই যেগুলো কার সেটি-ই হয়তো আমরা জানি না।.

আসুন জেনে নিই প্রাচীন ভারতের মহান কূটনীতিবিদ এবং তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আচার্য্য চাণক্যের কিছু অমর নীতি বাক্য:-


১. অপরের ভূল থেকে নিজে শিক্ষা নাও। কারণ, সবকিছু নিজের উপর প্রয়োগ করে শিখতে চাইলে তোমার আয়ু কম পড়বে।

২. কোনো ব্যক্তির খুব বেশী সহজ-সরল হওয়া উচিৎ নয়। কারণ, সোজা গাছ এবং সোজা মানুষদের প্রথমে কাটা হয়।

৩. যদি কোনো সাপ বিষধর নাও হয়, তবুও তার উচিৎ বিষধর হওয়ার ভান করা - যেন সে ইচ্ছা করলেই বিষাক্ত দংশন করতে পারে। একই ভাবে দুর্বল ব্যক্তিদেরও সবসময় নিজেদের দুর্বলতাগুলি লুকিয়ে রাখা উচিৎ।

৪. প্রত্যেক মিত্রতার পেছনে কোনো-না-কোনো স্বার্থ অবশ্যই থাকে। এটা একটা কটূ সত্য।

৫. কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার আগে সর্বদা নিজেকে এই তিনটি প্রশ্ন করবে- আমি এটা কেন করতে চলেছি? এর পরিনাম কী কী হতে পারে? আমার সফলতার সম্ভাবনা কতটা? যদি ঐ প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাও, তবেই কাজটা শুরু কর।

৬. একবার কোনো কাজ শুরু করার পর আর অসফল হওয়ার ভয় রাখবে না, এবং কাজ ছাড়বে না। যারা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে তারাই সবচেয়ে সুখী।

৭. সবচেয়ে বড় গুরুমন্ত্র হল, নিজের গোপন বিষয় অপরকে জানাবে না। এটা তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।

৮. কোনো কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা উচিৎ নয়। পরমূহুর্তে কী ঘটতে চলেছে তা কে বলতে পারে?

৯. যা ঘটে গেছে তা ঘটে গেছে। যে সময় অতীত হয়েছে সেটা নিয়ে ভেবে অনুশোচনা করে সময় নষ্ট করা অর্থহীন। যদি তোমার দ্বারা কোনো ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে শ্রেষ্ঠ করার চেষ্টা করা উচিৎ, যাতে ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

১০. কোনো দূর্বল ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা করা আরও বেশী বিপদের। কারণ, তারা এমন সময় এবং এমন জায়গায় আঘাত করতে পারে, যেটা আমরা কল্পনাও করিনি।

১১. অহংকারের মতো শত্রু নেই। সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।

১২. একটি দোষ অনেক গুণকেও গ্রাস করে।

১৩. ইন্দ্রিয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখ। ইন্দ্রিয়ের যে অধীন, তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।

১৪. সর্বদা চুপচাপ এবং গুপ্তরূপে কাজ করা উচিৎ।

১৫. যে ব্যক্তি নিশ্চিতকে ছেড়ে অনিশ্চিতের দিকে ধাবিত হয়, তার উভয়ই নষ্ট হয়।

১৬. অতি সৌন্দর্য্যের জন্য সীতার হরণ হয়েছিল, অতি গর্বের কারণে রাবণের পতন হয়েছিল এবং অতি দানী হওয়ার জন্য বলিকে পাতালে যেতে হয়েছিল। সুতরাং ‘অতি’-কে সর্বদা ত্যাগ করা উচিৎ।

১৭. ভয়কে কেবল ততক্ষণ ভয় কর, যতক্ষণ সেটা তোমার থেকে দূরে আছে।

১৮. তোমার প্রতিবন্ধকতাকে তোমারই পক্ষে কাজে লাগাও।

১৯. যদি তুমি অবস্থাকে তোমার পক্ষে আনতে না পার, তবে শত্রুদের জন্য তা জটিল করে দাও।

২০. যদি তুমি শক্তিশালী হও, তবে শত্রুকে দেখাও যেন তুমি দুর্বল। আর যদি তুমি দুর্বল হও, তবে শত্রুকে দেখাও যেন তুমি শক্তিশালী।

চার 'চাণক্য নীতি' যা নিজে জানুন, অপরকে জানাবেন না

চার এমন নীতির কথা চাণক্য বলেছেন, যা কখনই অন্যের সঙ্গে শলাপরামর্শ করা উচিত নয়।
আর্থিক ক্ষতির কথা
নিজের জীবনের আর্থিক ক্ষতির কথা কাউকে জানাবেন না। যদি আপনি অর্থ সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যান, তা নিজের মধ্যেই চেপে রাখুন। চাণক্যের মতে আর্থিক সঙ্কটের কথা জেনে কেউ আপনাকে সাহায্য করবে না, আপনার পাশে দাঁড়াবে না, দাঁড়ালেও তা হবে কপটতা। তাঁর মতে সমাজের দরিদ্র কখনই সম্মান পায় না।
ব্যক্তিগত সমস্যার কথা
নিজের কোনও সমস্যার কথা সর্ব সমক্ষে না বলাই চাণক্যের নীতি। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা গোপন রাখার কথাই বলেছেন চাণক্য। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা সবাই জানলে তা উপহাসিত হতে পারে। সবাই তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবে।
স্ত্রীর চরিত্রের কথা
অন্যের কাছে নিজের স্ত্রীর চরিত্র সবসময় লুকিয়ে রাখা চাণক্যের নীতিকথার অন্যতম একটি। বুদ্ধিমান ব্যক্তি এমনটাই করেন। যারা নিজের স্ত্রীকে নিয়ে সবার সামনে চর্চা করেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা এমন কিছু বলে ফেলেন, যা শোভনীয় নয়। যার পরিণতি ভয়ানক হতে পারে।
অবহেলিতদের থেকে অপমানিত হওয়ার কথা
অবহেলিতদের থেকে অপমানিত হওয়ার কথা গোপন রাখুন। চাণক্য মনে করতেন, এই ঘটনার বহিঃপ্রকাশ যে কোনও ব্যক্তিকে হাস্যকর উপদানে পরিণত করতে পারে। যা ওই ব্যক্তির গর্ববোধে আঘাত করবে, অহংকে আঘাত করবে।   
   

শত্রুর দাপটে দিশেহারা? জেনে নিন কী বলছে চাণক্য-নীতি

চাণক্য-নীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও প্রশ্নাতীত। কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য স্বয়ং এই নীতি রচনা করেছিলেন কি না, সে কথা অবান্তর। এই নীতিমালায় আসলে প্রতিফলিত হয়েছে শত শত বছরের ভারতীয় প্রজ্ঞা। যে কোনও সংকটে, যেকোনও সমস্যায় চাণক্যনীতির সরামর্শ রয়েছে। কোনও বিশেষ কালের প্রেক্ষিতে এই নীতীমালাকে দেখা যাবে না। আজ, এই কর্পোরেট-বিশ্বেও চাণক্য-নীতি সমান কার্যকর বলেই মনে করেন ম্যনেজমেন্ট গুরুরা।
শত্রুতা সভ্যতায় এক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। কোথা থেকে এবং কী করে শত্রুর উদয় ঘটে জীবনে, তা সব সময়ে বোঝা সম্ভব নয়। জীবনের কোনও বিশেষ পর্বে এসে দেখা যায়, তীব্র সব শত্রুতার শিকার হতে হচ্ছে। কখনও প্রতিদ্বন্দিতা, কখনও যৌন ঈর্ষা, কখনও বা বিনা কারণেই শত্রুতা মাথা চাড়া দেয়। শত্রু এবং শত্রুতা বিষয়ে চাণক্য-নীতি কী বলছে দেখা যাক।
•১। প্রতিটি সম্পর্কের পিছনে কোনও না কোনও উদ্দেশ্য কাজ করে। উদ্দেশ্যশূন্য সম্পর্ক হতে পারে না। বন্ধুত্ব এবং শত্রুতাও কোনও না কোনও উদ্দেশ্য দ্বারা প্রণোদিত। শত্রুতার ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্যটিকে বোঝার চেষ্টা করুন।
•২। শত্রুর ক্ষমতার সীমা রয়েছে। তারও দুর্বলতা রয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত শত্রুর দুর্বল দিকগুলি জানতে পারছেন, ততক্ষণ শত্রুর সঙ্গে সংঘাতে না-যাওয়াই ভাল। দুর্বলতা জানা গেলে তার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া যেতে পারে।
• ৩।শত্রুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়তেই পারেন। হারের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সন্ধির চেষ্টা করতে হবে বলে জানাচ্ছে চাণক্য-নীতি। নিজের দুর্বলতাকে ঢাকা দিতে সন্ধি সব থেকে সম্মানজনক ব্যবস্থা।
•৪। শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করা কর্তব্য। রাষ্ট্রের জন্য এমন ক্ষেত্রে কড়া গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে চাণক্য-নীতিতে। আর ব্যক্তিগত স্তরে প্রয়োজন সতর্কতার, একথাও বলছে চাণক্য-নীতি।


চাণক্য নীতি দর্পণ সারাংশ:

(১) যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।
(২) সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্যে সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বা’র ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। জলের নিচে মাছের গতিবিধি যেমন জল পান করে বা পান না করেও বোঝা সম্ভব নয়, অনুরূপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।”
(৩) বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী – এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।
৪) মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এই বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।
(৫) যারা পরিশ্রমী, তাদের জন্যে কোনকিছুই জয় করা অসাধ্য কিছু নয়। শিক্ষিত কোন ব্যক্তির জন্যে কোন দেশই বিদেশ নয়। মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।
(৬) বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।
(৭) মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।

উইকিপিডিয়াতে চাণক্য

চাণক্য
চাণক্য (সংস্কৃত: चाणक्य;   উচ্চারণ শুনুন (সাহায্য•তথ্য)) বা কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ)একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন।[৩] চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।[৪][৫][৬][৭] রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।[৮] চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।[৫] প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উৎস
চাণক্য সম্বন্ধে খুব সামান্যই ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, অধিকাংশ উৎসে ঐতিহাসিকতার তুলনায় কল্প কথা স্থান করে নিয়েছে। থমাস ট্রটমান চাণক্য ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সম্পর্ক নিয়ে চারটি উৎস চিহ্নিত করেছেন।এগুলি হল সিংহলী বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও তাঁর পালি টীকা বংসট্ঠপ্পকাসিনি, হেমচন্দ্র রচিত জৈন গ্রন্থ পরিশিষ্টপর্ব, সোমদেব রচিত কথাসরিৎসাগর ও ক্ষেমেন্দ্র রচিত বৃহৎকথামঞ্জরী নামক দুইটি কাশ্মীরি গ্রন্থ এবং বিশাখদত্ত রচিত সংস্কৃত নাটক মুদ্রারাক্ষস।
প্রথম জীবন
চাণক্য একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশটীকা অনুসারে, তক্ষশীলায় তাঁর জন্ম হয়।জৈন পুঁথি অদ্বিধন চিন্তামণি চানোক্যকে দ্রমিলা নামে অভিহিত করা হয়েছে, যার অর্থ তিনি দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী ছিলেন। হেমচন্দ্র রচিত পরিশিষ্টপর্ব গ্রন্থানুসারে, চাণক্য চণক নামক গ্রামে চণিন নামক এক ব্রাহ্মণ ও তাঁর পত্নী চণেশ্বরীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। অন্য উৎস মতে, চণক তাঁর পিতার নাম ছিল।
চাণক্য প্রাচীন ভারতের অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করেন ও পরবর্তীকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আচার্য্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বেদ সম্বন্ধে একজন পণ্ডিত  ছিলেন এবং বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।.
মৌর্য্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
বিশাখদত্ত রচিত মুদ্রারাক্ষস নাম্মক সংস্কৃত নাটকে নন্দ সাম্রাজ্য পতনে চাণক্যের ভূমিকা বর্ণিত রয়েছে। এই গ্রন্থানুসারে, হিমালয়ের একটি পার্বত্য রাজ্যের অধীশ্বর পর্বতেশ্বরের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা চাণক্য কূটনৈতিক মিত্রতা স্থাপন করে নন্দ সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। কিন্তু এই সময়, পর্বতেশ্বরকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হলে মলয়কেতু তাঁর স্থানে সিংহাসনে আরোহণ করেন। নন্দ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রাক্ষসের সঙ্গে মিলিত ভাবে মলয়কেতু নন্দ সাম্রাজ্যের অধিকৃত এলাকা দাবি করেন। শেষ নন্দ সম্রাট ধননন্দের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মলয়কেতুর সহায়তায় রাক্ষস রাজধানী আক্রমণ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এই পরিস্থিতিতে চাণক্য যেন তেন প্রকারে রাক্ষসকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাতে চেয়েছিলেন। রাক্ষসের প্রতীক মুদ্রাটি হস্তগত করে চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে উদ্দেশ্য করে একটি নকল চিঠি প্রস্তুত করেন। এই চিঠিতে রাক্ষসের মুদ্রার ছাপ (সীলমোহর) দিয়ে লেখা হয় যে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের শিবিরে যোগ দিতে ইচ্ছুক। চাণক্য প্রথমেই মলয়কেতুর নিকট এই চিঠির বিষয়ে বার্তা পাঠালে তাতে বিশ্বাস করে মলয়কেতু রাক্ষসের সঙ্গত্যাগ করেন। এই ভাবে চাণক্য রাক্ষসকে তাঁর সঙ্গীদের থেকে দূরে সরিয়ে দেন। পরবর্তী কৌশল হিসেবে তিনি রাক্ষসের বন্ধু চন্দনদাসের মৃত্যুদণ্ড দিলে রাক্ষস তাঁকে বাঁচাতে, আত্মসমর্পণে ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য হন।

বিন্দুসারের সঙ্গে সম্পর্ক
জৈন প্রবাদানুসারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উপদেষ্টা চাণক্য শত্রু দ্বারা বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিষেধক তৈরী করার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে তাঁর অজান্তে অল্প মাত্রায় বিষ পান করাতেন।একদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য তাঁর বিষযুক্ত খাবার অন্তঃসত্ত্বা দুর্ধরার সঙ্গে ভাগ করে খেলে, দুর্ধরার মৃত্যু হয়। তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে চাণক্য সদ্যমৃত দুর্ধরার পেট কেটে তাঁকে বের করে আনলে বিন্দুসারের জন্ম হয়।পরবর্তীকালে বিন্দুসার মৌর্য্য সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করলে চাণক্য তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব অনুসারে, বিন্দুসারের একজন মন্ত্রী সুবন্ধু চাণক্যকে অপছন্দ করতেন। তিনি বিন্দুসারকে জানান যে তাঁর মাতা দুর্ধরার মৃত্যুর জন্য চাণক্য দায়ী ছিলেন। এই ঘটনার কথা জানতে পেরে বিন্দুসার প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলে বৃদ্ধ চাণক্য জৈন আচার সল্লেখনা বা স্বেচ্ছা-উপবাস করে দেহত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই সময় চাণক্য যে তাঁর মাতার মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী ছিলেন না, তা অনুসন্ধান করে বিন্দুসার জানতে পেরে নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সুবন্ধুকে চাণক্যের নিকট পাঠান যাতে, চাণক্য তাঁর মৃত্যু সঙ্কল্প ত্যাগ করেন। কিন্তু সুযোগসন্ধানী সুবন্ধু এই সময় চাণক্যকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন।
রচনা
অর্থশাস্ত্র এবং চাণক্য নীতি নামক দুইটি গ্রন্থ চাণক্য রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কল্যাণকারী ভূমিকা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, শাসকের ভূমিকা সম্বন্ধে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে।[২২] অর্থশাস্ত্রের অধিকাংশ শ্লোকের রচয়িতা হিসেবে কৌটিল্যের নাম পাওয়া যায়, একটি শ্লোকে বিষ্ণুগুপ্তের নাম পাওয়া যায়। থমাস ট্রটমানের মতে, অর্থশাস্ত্রের রচয়িতার প্রকৃত নাম বিষ্ণুগুপ্ত ও গোত্র নাম কৌটিল্য।বিষ্ণুশর্মা রচিত পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থে চাণক্য ও বিষ্ণূগুপ্ত যে একই ব্যক্তির বিভিন্ন নাম, তা বলা হয়েছে।থমাস বারো ইত্যাদি কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, অর্থশাস্ত্র আসলে বেশ কিছু পুরনো রচনার সঙ্কলন এবং চাণক্য এই গ্রন্থের বেশ কয়েকজন লেখকের একজন, অর্থাৎ তাঁদের মতে চাণক্য ও কৌটিল্য ভিন্ন ব্যক্তি।

চাণক্য এর মোট ১০৮টি স্লোক ।

। ০১।
বিদ্যাবত্তা এবং রাজপদ কখনোই সমান হয় না। রাজা কেবলমাত্র নিজ রাজ্যেই সম্মান পান, বিদ্বান স্বদেশ-বিদেশ  সর্বত্র সম্মান পান।
.
। ০২।
পণ্ডিত ব্যক্তি সকল গুণের আর মূর্খ ব্যক্তি সকল দোষের আধার- এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই সহস্র মূর্খ অপেক্ষা একজন পণ্ডিত বিশিষ্ট বা অধিকতর গ্রাহ্য রূপে পরিগণিত হন।
.
। ০৩।
যে ব্যক্তি পরের স্ত্রীকে মাতৃজ্ঞানে দেখেন, পরের দ্রব্যকে মাটির ঢেলার মতো জ্ঞান করেন ।অর্থাৎ নির্লোভ থাকেন এবং সকল জীবে আত্মজ্ঞান পোষণ করেন- তিনিই যথার্থ জ্ঞানী।
.
। ০৪।
যে ব্যক্তি গুণহীন, তার উচ্চবংশে জন্মগ্রহণেও সার্থকতা কোথায় ? বিপরীতপক্ষে, যিনি বিদ্যান, তিনি উচ্চবংশে জন্মগ্রহণ না করলেও দেবতাদের দ্বারা পূজিত (সমাদৃত) হন।
.
। ০৫।
বিদ্যাহীন পুরুষ রূপযৌবনযুক্ত অথবা  উচ্চবংশজাত  হলেও গন্ধহীন পলাশ ফুলের মতো সমাদর লাভে সক্ষম হন না।
.
। ০৬।
চাঁদ তারকাদের অলঙ্কার, স্বামী নারীর অলঙ্কার, রাজা পৃথিবীর অলঙ্কার আর বিদ্যা সকলজনের অলঙ্কার।
.
। ০৭।
যে পিতামাতা তাঁদের পুত্রকে যথাযোগ্য শিক্ষা প্রদান করেননি, সেই পুত্রের কাছে মাতা এবং পিতা শত্রুরূপে পরিগণিত হন। কেননা হাঁসের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, তেমনি সেই পুত্রও বিদ্বান সমাজে স্থান পায় না।
.
। ০৮।
একটিমাত্র গুণবান পুত্র তুলনামূলকভাবে ভালো, কেননা শত মূর্খ পুত্রেও কোন কাজ হয় না। একটিমাত্র চন্দ্রই  রাতের অন্ধকার দূর করে, অসংখ্য তারা তা পারে না।
.
। ০৯।
সন্তানের পাঁচ বৎসর বয়স পর্যন্ত তাকে পিতা মাতা স্নেহে প্রতিপালন করবেন, তারপরের দশ বৎসর তাকে যথাযোগ্য শাসনে শিক্ষা দেবেন এবং পুত্রের ষোল বৎসর বয়স হলে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করবেন।
.
। ১০।
শৈশব অর্থাৎ জন্মাবধি পাঁচ বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে  অকারণে স্নেহ প্রদর্শন করলে অনেক দোষের সৃষ্টি হয়, উপযুক্ত শাসণ প্রদান করলে কিন্তু বহু গুণের জন্ম হয়। সুতরাং পুত্র এবং শিষ্যকে যেন যথাযোগ্য শাসন করা হয়, অতিরিক্ত স্নেহ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
.
। ১১।
যেমন সুগন্ধ ফুলে ভরা একটিমাত্র গাছের দ্বারাই সমগ্র বনভূমি সুগন্ধে  আমোদিত হয়, তেমনি একটিমাত্র সুপুত্রের দ্বারা সমগ্র বংশ গৌরবান্বিত হয়।
.
। ১২।
যেমন একটিমাত্র মরা শুষ্ক বৃক্ষের আগুনের দ্বারা সমগ্র বন দগ্ধ হয়, তেমনি একটিমাত্র কুপুত্রের দ্বারা সমগ্র কুল কলঙ্কিত হয়।
.
। ১৩।
মূর্খ ব্যক্তি দীর্ঘ পোশাক পরিচ্ছদে ভূষিত হয়ে দূর থেকেই শোভা পায়, যতক্ষণ পর্যন্ত মূর্খ কোন কথা না বলে ততক্ষণই শোভা পায়, কথা বললেই তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
.
। ১৪।
অমৃত বিষ থেকেও গ্রহণ করা চলে, সোনা অশুচি স্থল থেকেও গ্রহণ করা চলে, শ্রেষ্ঠ বিদ্যা নীচ ব্যক্তির কাছ থেকেও গ্রহণ করা চলে, রমণীশ্রেষ্ঠা নীচ কুল থেকেও গ্রহণ করা চলে।
.
। ১৫।
যে ব্যক্তি আনন্দানুষ্ঠানে, বিপদকালে, আকালের সময়, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, বিচারালয়ে অর্থাৎ মামলা-মোকদ্দমা চলাকালীন সাক্ষ্যাদির প্রয়োজনে)এবং শবদাহকালে পাশে উপস্থিত থাকেন, তিনিই প্রকৃত বন্ধু।
.
। ১৬।
যে ব্যক্তি সাক্ষাতে মিষ্ট কথা বলে কিন্তু অসাক্ষাতে কাজের ক্ষতি করে, সেরকম মুখে মধু অন্তরে বিষ বন্ধুকে ত্যাগ করা উচিত।
.
। ১৭।
যে ব্যক্তি একবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে এমন বন্ধুর সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্ব কামনা করে সে প্রকৃতপক্ষে মতো নিজের ধ্বংশ ডেকে আনে।
.
। ১৮।
অবিশ্বাসীকে কখনো বিশ্বাস করবে না এবং বন্ধুকেও অতিরিক্ত  বিশ্বাস করবে না। কেননা, বন্ধু কখনো কোনো কারণে  ক্ষুব্ধ হলে সে তোমার সকল দোষ অন্যের কাছে প্রকাশ করে দিতে পারে।
.
। ১৯।
ভৃত্যের যথার্থ স্বরূপ তাঁর কাজের মাধ্যমে জানবে, বন্ধুর যথার্থ স্বরূপ রোগাদি বিপদের সময়ে জানবে। মিত্রের যথার্থ স্বরূপ উপদ্রব উপস্থিত হলে জানবে এবং ধনসম্পত্তি নাশের কালে স্ত্রীর যথার্থ স্বরূপ জানবে।
.
। ২০।
হাতের কাঁটা দিয়ে যেমন পায়ে বেঁধা কাঁটা তোলা হয় তেমনি তোমার উপকার গ্রহণ করেছে এমন শত্রু দিয়ে অন্য শত্রুকে উচ্ছেদ করবে।
.
। ২১।
অকারণে কেউ কারো মিত্রও হয় না, শত্র“ও হয় না। কারণবশতঃই  প্রযোজনে কেউ কারো মিত্র বা শত্র“ বলে পরিগণিত হয়ে থাকে।
.
। ২২।
দুর্জন ব্যক্তি মিষ্টভাষী হলেও তা বিশ্বাসের ব্যাপার নয়। কেননা, তার জিভের ডগায় থাকে মধু- আর অন্তরে থাকে তীব্র বিষ।
.
। ২৩।
দুর্জন ব্যক্তি বিদ্যান হলেও তাকে ত্যাগ করা উচিত। কোনো সাপ মণিতে ভূষিত হলেও তা ভয়ঙ্করই থাকে।
.
। ২৪।
সাপের স্বভাব দংশন করা , দুর্জনেরও তাই। তবে দুর্জন সাপের চাইতেও বেশি ক্রূর। কেননা, সাপকে মন্ত্র কিংবা ওষধি দ্বারা বশে আনা যায়- কিন্তু দুর্জনকে কে নিবৃত্ত করবে ?
.
। ২৫।
নখযুক্ত প্রাণী, নদী, শিং আছে এমন প্রাণী, অস্ত্রধারী পুরুষ, নারী এবং রাজপুরুষকে কখনও বিশ্বাস করা উচিত নয়।
.
। ২৬।
হাতী থেকে হাজার হাত দূরে থাকবে, ঘোড়া থেকে একশ’ হাত দূরে থাকবে, শিংওয়ালা প্রাণী থেকে দশ হাত দূরে থাকবে আর দুর্জন লোক কাছে এলে সেই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে।
.
। ২৭।
বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য ধন-সম্পত্তি রক্ষা করবে, ধন সম্পত্তির বিনিময়েও স্ত্রীকে রক্ষা করবে, স্ত্রী বা ধন-সম্পত্তির বিনিময়েও নিজেকে সকল সময় রক্ষা করবে।
.
। ২৮।
পরের স্ত্রী, পরের জিনিস, পরনিন্দা, অন্যের প্রতি উপহাস এবং গুরুজনের সামনে চপলতা পরিত্যাগ করবে।
.
। ২৯।
কুল রক্ষার জন্য একজনকে ত্যাগ করা চলে, গ্রাম রক্ষার ন্য কুল ত্যাগ করা চলে, দেশ রক্ষার জন্য একটি গ্রাম ত্যাগ করা চলে আর নিজেকে রক্ষার জন্য  পৃথিবী ত্যাগ করা চলে।
.
। ৩০।
বুদ্ধিমান ব্যক্তি একপায়ে চলেন, আরেক পায়ে স্থির থাকেন। পরের জায়গা না দেখে আগের জায়গা ছাড়া উচিত নয়।
.
। ৩১।

লোভীকে টাকা-পয়সা দিয়ে, ক্রুদ্ধকে হাত জোড় করে, মূর্খকে তার মন জুগিয়ে এবং পণ্ডিতকে যথার্থ কথা বলে বশীভূত করবে।
.
। ৩২।
প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ধনক্ষয়, মনঃকষ্ট, নিজ বাড়ির অনাচার, বঞ্চনা এবং অপমানের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না।
.
। ৩৩।
সম্পত্তি এবং শস্য প্রভৃতির ক্রয়-বিক্রয় অথবা এই সব জিনিস ধার দিয়ে সুদের আদান-প্রদানের সময়, বিদ্যার্জনের সময়, খাওয়ার সময় এবং মামলা-মোকদ্দমার সময় সর্বদা লজ্জাশূন্য হওয়া উচিত অর্থাৎ এইসব ব্যাপারে লজ্জা করা উচিত নয়।
.
। ৩৪।
ধনবান ব্যক্তি, ধার্মীক উচ্চবংশ, রাজা, নদী এবং পঞ্চমতঃ চিকিৎসক - এই পাঁচজন যে দেশে বাস করেন না সেই দেশে বসবাস করা উচিত নয়।
.
। ৩৫।
যে দেশে গুণীর সম্মান নেই, জীবিকার ব্যবস্থা নেই, কোন বন্ধু নেই এবং বিদ্যার্জনের কোন ব্যবস্থা নেই- সেই দেশ পরিত্যাগ করা উচিত।
.
। ৩৬।
কাজের পরিকল্পনা মনে থাকবে- তা মুখে যেন প্রকাশ না পায়। কেননা, যে কাজের কথা অন্য লোক আগেই জেনে ফেলে- সেই কাজে সাফল্য আসে না।
.
। ৩৭।
বিচক্ষণ ব্যক্তির, রোগ-দুর্ভিক্ষ-পীড়িত দুর্যোগের দেশ, চুরি ,দুর্নীতি প্রভৃতি নিন্দনীয় জীবিকা, দুশ্চরিত্রা  অথবা রুগ্না স্ত্রী, খড়স্রোতা  নদী, খারাপ দ্রব্য এবং বাসী আহার্য বর্জন করবেন।
.
। ৩৮।
যেহেতু ঋণের অবশেষ, আগুনের অবশেষ, রোগের অবশেষ পুনরায় বাড়ে, সেহেতু এগুলির অবশেষ রাখবে না।
.
। ৩৯।
মানুষের জ্বর চিন্তা, প্রখর সূর্যতাপ কাপড়ের জ্বর, স্ত্রীর জ্বর স্বামীর সোহাগ না পাওয়া আর মৈথুন অশ্বের জ্বর।
.
। ৪০।
যাঁর পুত্র, ভৃত্য এবং স্ত্রী বশে আছে, অভাবের মধ্যেও যিনি প্রসন্ন থাকেন- তিনি এই পৃথিবীতে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে স্বর্গে আছেন।
.
। ৪১।
যাঁর স্ত্রী দুশ্চরিত্রা, বন্ধু প্রতারক, ভৃত্য মুখে মুখে উত্তর করে এবং যিনি সর্পযুক্ত গৃহে বাস করেন- তাঁর মৃত্যু অবধারিত- এ ব্যাপারে সংশয় নেই।
.
। ৪২।

যার ঘরে মা নেই অথবা যার স্ত্রী রুক্ষভাষিণী- তার বনে যাওয়া উচিত। কেননা তার পক্ষে বনও যা ঘরও তা-ই।
.
। ৪৩।
ঋণী পিতা, দুশ্চরিত্রা মাতা, অতিরূপবতী স্ত্রী এবং মূর্খ পুত্র শত্রুরূপে পরিগণিত হয়ে থাকে।
.
। ৪৪।
বিদ্যাহীনের জীবন শূন্য, বন্ধুহীনের সকল দিক শূন্য, পুত্রহীনের গৃহ শূন্য আর দরিদ্রের সকলই শূন্য।
.
। ৪৫।
কোকিলের কণ্ঠস্বরই তার রূপ, পাতিব্রত্যই স্ত্রীর রূপ, কুৎসিত পুরুষের বিদ্যাই রূপ এবং তপস্বীদের ক্ষমাই রূপ ।
.
। ৪৬।
বংশের দোষে কৃপণ হয়, কর্মের দোষে দরিদ্র হয়, মাতার বংশের ধারাবাহিকতায় পাগল হয় এবং পিতার দোষে মূর্খ হয়।
.
। ৪৭।
আগুনের কাছে জাতিভেদ নাই ।উচ্চবংশের ব্যক্তি অপর সকল মানুষের গুরু, নারীদের স্বামীই একমাত্র গুরু এবং সকল মানুষদের জন্য অতিথি গুরু।
.
। ৪৮।
অতিরিক্ত অহঙ্কারে লঙ্কা নগরী বিনষ্ট হয়েছিলো, অতিরিক্ত অভিমানের কারণে কৌরবেরা বিনষ্ট হয়েছিলো, অতিরিক্ত দানের ফলে রাজা বলি সত্যে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কোন কিছুরই অতিরিক্ত ভালো নয় ।
.
। ৪৯।
মানান সই পরিচ্ছদ ছাড়া অলঙ্কার শোভা পায় না, ঘৃত বিহীন আহার সুখকর হয় না, যে নারীর সুন্দর  স্তন নাই- সে নারী শোভা পায় না, বিদ্যাহীন জীবনও নিরর্থক।
.
। ৫০।
আহার্য দ্রব্য এবং তা হজম করার শক্তি থাকা, কামোপভোগের ক্ষমতা এবং সুন্দরী স্ত্রী থাকা, ধন-সম্পত্তি এবং দানের ইচ্ছা থাকা- এসব অল্প তপস্যার ফল নয়।
.
। ৫১।
পুত্রের জন্য স্ত্রীর প্রয়োজন, পিণ্ডদানের জন্য পুত্রের প্রয়োজন, হিতসাধনের জন্য বন্ধুর প্রয়োজন আর সব কিছুর জন্যই ধনের প্রয়োজন।
.
। ৫২।
যথার্থ বাক্য দুর্লভ, সুখকর পুত্র দুর্লভ, সমানগুণসম্পন্না স্ত্রী দুর্লভ, মঙ্গলকারী আত্মীয়স্বজন দুর্লভ।
.
। ৫৩।
সকল পর্বতে মাণিক্য মেলে না, সকল হাতীতে গজমুক্তা উৎপন্ন হয় না, সজ্জন পুরুষের সর্বত্র দেখা পাওয়া যায় না, সকল বনে চন্দন থাকে না।
.
। ৫৪।
জ্ঞানী নির্ধন হলেও শোচনীয় নন, যে ব্যক্তির বন্ধু পণ্ডিত তিনিও শোচনীয় নন, পুত্রপৌত্রের দ্বারা পরিপালিতা বিধবা নারীও শোচনীয় নন।
.
। ৫৫।
বিদ্যাহীন পুরুষ শোকের বিষয়, বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষের যে মিলনে সন্তান উৎপাদিত হয় না- তাও শোকের। করদাতা প্রজাসাধারণ যদি নিরাহার থাকে তবে তাও দুঃখের ।এ অবস্থায় অরাজক রাজ্যও দুঃখের।
.
। ৫৬।
শ্রেষ্ঠ বংশীয় পুরুষের সঙ্গে বিবাহাদি দ্বারা সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়েন না, পণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়েন না এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়ে না।
.
। ৫৭।
পরাধীন জীবিকা কষ্টকর, নিরাশ্রয় ব্যক্তির পরগৃহে বসবাস কষ্টকর, ধনহীনের পক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কষ্টকর আর দারিদ্র্য সকল কষ্টের কারণ।
.
। ৫৮।
চোরের আবার ধর্ম কী ! দুষ্টের আবার ক্ষমা কী ! গণিকার আবার স্নেহ প্রেম  কী ! কামুকের আবার সততা কী !
.
। ৫৯।
ভৃত্যের আবার সম্মান কোথায় ! ক্রোধপরায়ণ ব্যক্তির আবার সুখ কোথায় ! স্ত্রীলোকের আবার সতীত্ব কোথায় ! আর দুষ্টের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব কোথায় !
.
। ৬০।
দুর্বলের রাজাই বল, শিশুর রোদনই বল, মূর্খের নীরব থাকাই বল আর চোরের মিথ্যাশ্রয়ই বল।
.
। ৬১।
যে ব্যক্তি নিশ্চিত বিষয় ত্যাগ করে অনিশ্চিতের আশ্রয় গ্রহণ করে, তার নিশ্চিত বিষয় নষ্ট হয় আর অনিশ্চিত তো নষ্ট হয়ই।
.
। ৬২।
শুকনো মাংস খাওয়া, বৃদ্ধা স্ত্রীর সঙ্গে মিলন, শরতের রোদ গায়ে লাগানো, সদ্য পাতা জমাট না হওয়া  দই  খাওয়া, ভোরে স্ত্রীসঙ্গম, ভোরে ঘুমানো- এই ছয়টি সদ্যপ্রাণঘাতক।
.
। ৬৩।
সদ্য কাটা হয়েছে এমন মাংস আহার, সদ্য প্রস্তুত অন্ন গ্রহণ, যুবতী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস, দুগ্ধপান, ঘৃতসেবন এবং ঈষৎ উষ্ণ জল পান- এই ছয়টি সদ্য সদ্যই প্রাণবর্ধক।
.
। ৬৪।
সিংহের কাছ থেকে একটি, বকের কাছ থেকে একটি, কুকুরের কাছ থেকে ছয়টি, গাধার কাছ থেকে তিনটি, কাকের কাছ থেকে পাঁচটি এবং মোরগের কাছ থেকে চারটি গুণ শেখার আছে।
.
। ৬৫।
যে ব্যক্তি ক্ষুদ্র বা মহৎ যে কোন কাজ করতে চান তিনি সেই কাজ খুব ভালোভাবে যত্নের সঙ্গে করবেন- সিংহের কাছ থেকে এই একটি শিক্ষণীয়ের কথা বিদ্বানেরা বলে থাকেন।
.
। ৬৬।
পণ্ডিত ব্যক্তি বকের মতো সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে অর্থাৎ বশীভূত রেখে স্থান-কাল-পাত্র বিচারপূর্বক যথাযথ কাজ করবেন- বকের কাছ থেকে ইন্দ্রিয় সংযত রাখার এই একটি শিক্ষণীয়ের কথা পণ্ডিতেরা বলে থাকেন।
.
। ৬৭।
প্রভুর মঙ্গলের জন্য সর্বদা চিন্তা, অল্পে সন্তুষ্টি, সহজে ঘুম আসা, তাড়াতাড়ি জেগে ওঠা, প্রভুভক্তি, সাহস- এই ছয়টি কুকুরের গুণ বলে জানবে, অর্থাৎ কুকুরের কাছ থেকে শিক্ষণীয় গুণ বলে জানবে।
.
। ৬৮।
গাধা বিশ্রামহীনভাবে ভার বহন করে, শীতে বা গরমে কষ্ট বোধ করে না এবং সকল সময়ই সন্তুষ্ট থাকে। গাধার কাছ থেকে এই তিনটি বিষয় শিক্ষণীয় আছে।
.
। ৬৯।
গোপনে মৈথুন ক্রিয়া, চটপটে ভাব, যথাকালে খাদ্যাদি সংগ্রহ, কখনো অসচেতন না থাকা এবং আলস্যহীনতা- এই পাঁচটি গুণ কাকের কাছ থেকে শিক্ষণীয়।
.
। ৭০।
আপ্রাণ যুদ্ধ, প্রত্যুষে নিদ্রাত্যাগ, পরিবারের সকলের সঙ্গে  অথবা  বন্ধুর সঙ্গে আহার গ্রহণ এবং বিপদাপন্ন স্ত্রীলোককে রক্ষা করা- মোরগের কাছে এই চারটি গুণ শিক্ষণীয় আছে।
.
। ৭১।
সক্ষম ব্যক্তির কাছে কোন কাজই কঠিন নয়, ব্যবসায়ীর কাছে কোন পথই দূর নয়, বিদ্বানের কাছে কোন দেশই বিদেশ নয় এবং মিষ্টভাষীর কাছে কেউই পর নয় ।
.
। ৭২।
ইন্দ্রিয়ের অসংযম সকল অনিষ্টের পথ, ইন্দ্রিয়ের জয় সকল উন্নতির পথ। যে পথে মঙ্গল, সে পথে চল।
.
। ৭৩।
বিদ্যার সমান বন্ধু নাই, ব্যাধির সমান শত্রু নাই, পুত্রস্নেহের সমান স্নেহ নাই এবং দৈবের সমান বল নাই।
.
। ৭৪।
পৃথিবীর আবরণ সমুদ্র, গৃহের আবরণ প্রাচীর, দেশের আবরণ রাজা আর স্ত্রীলোকের আবরণ চরিত্র।
.
। ৭৫।
স্ত্রীলোক ঘৃতপূর্ণ ঘটের সমান আর পুরুষ জ্বলন্ত আগুনের সমান। তাই পণ্ডিত ব্যক্তি ঘৃত এবং বহ্নিকে কখনোই একত্রে রাখবেন না (অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ সম্পর্করহিত স্ত্রী এবং পুরুষকে কখনোই এক জায়গায় রাখবেন না)।
.
। ৭৬।
স্ত্রীলোকের আহার পুরুষের দুই গুণ, পুরুষ অপেক্ষা তাদের বুদ্ধি চতুর্গুণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের বুদ্ধি পুরুষ অপেক্ষা ছয়গুণ আর কামশক্তি (অথবা ভোগলিপ্সা) পুরুষ অপেক্ষা আটগুণ- এরকম কথা শাস্ত্রে কথিত আছে।
.
। ৭৭।
যে আহারের পরিপাক হয়েছে তাকে প্রশংসা করবে, নির্দোষভাবে যৌবন অতিক্রম করেছে এমন স্ত্রীর প্রশংসা করবে, যুদ্ধ থেকে সসম্মানে ফিরে আসা বীরের প্রশংসা করবে এবং যে ফসল ঘরে উঠেছে তার প্রশংসা করবে।
.
। ৭৮।
উচ্চ বংশের ধার্মীক অসন্তুষ্ট হলে তাঁর আত্মিক উন্নতি হয় না, রাজা সন্তুষ্ট হলে তাঁর রাজ্য উন্নতি হয় না, বেশ্যা লজ্জাশীলা হলে তার আয় উন্নতি হয় না আর কুলবধূরা নির্লজ্জ হলে তাদের সতীত্ব থাকে না।
.
। ৭৯।
নীচবংশে জন্মগ্রহণ করে যদি কেউ রাজা হয়, কোন মূর্খের পুত্র যদি পণ্ডিত হয় অথবা কোন দরিদ্র যদি হঠাৎ প্রচুর সম্পত্তি লাভ করে তবে তারা এই জগৎকে তৃণের মতো তুচ্ছ জ্ঞান করে।
.
। ৮০।
যার প্রচুর ধনসম্পত্তি আছে সে যদি ব্রহ্মঘাতীও হয়, লোকে তাকে মেনে চলে, আর ধনসম্পত্তি না থাকলে চন্দ্রের মতো নির্মল বংশে জন্মগ্রহণ করলেও লোকে মান্য করে না।
.
। ৮১।
যে অধীত বিদ্যা পুঁথিতেই থেকে যায় (অর্থাৎ কাজে প্রয়োগের সময় মনে পড়ে না), যে ধন পরের হাতে চলে গেছে (অর্থাৎ নিজের অধিকারে নেই)- প্রয়োজনের সময় তা পাওয়া যায় না বলে সেই বিদ্যাকে বিদ্যা বলা চলে না, সেই ধনকে ধন বলা চলে না।
.
। ৮২।
বৃক্ষের ভয় ঝড়কে, পদ্মের ভয় শীতকালকে, পর্বতের ভয় বজ্রকে আর সজ্জনের ভয় দুর্জনকে।
.
। ৮৩।
রাজা যদি প্রাজ্ঞ ব্যক্তির উপর কার্যভার ন্যস্ত করেন তবে তাঁর তিনটি জিনিস লাভ হয়- যশ, স্বর্গলাভ এবং প্রভূত অর্থলাভ।
.
। ৮৪।
রাজা যদি মূর্খ লোকের হাতে কাজের ভার অর্পণ করেন তবে তিনি তিনটি দোষের ভাগী হন- নিন্দা, অর্থনাশ এবং নরকগমন।
.
। ৮৫।
পশুর মতো পরস্পর হিংসাদি স্বভাবের বহু মূর্খের দ্বারা সূর্য যেমন মেঘের দ্বারা আবৃত হয় তেমনি সকল গুণ আচ্ছাদিত হয়।
.
। ৮৬।
যে লোকের শস্যক্ষেত্র নদীর পাড়ে, যে লোকের স্ত্রী পরপুরুষে আসক্ত, যে লোকের পুত্রের বিনয় নেই, সেই লোকের জীবনধারণ মৃত্যুর সমান- এই ব্যাপারে সংশয় নাই।
.
। ৮৭।
পাথর জলে ভাসছে, বানর গান করছে- এইরকম অসম্ভব ঘটনা স্বচক্ষে ঘটতে দেখলেও বলা উচিত নয়।
.
। ৮৮।
যে কৃষকের ঘরে প্রচুর অন্ন থাকে- তার ঘরে সর্বদা সুখ বিরাজ করে, যার শরীরে রোগ নাই- সে সর্বদা সুখী, যে স্বামীর স্ত্রী প্রেমময়  প্রিয়তমা- সেই লোকের ঘরে সর্বদা উৎসবের আনন্দ।
.
। ৮৯।
অবহেলা কার্যনাশের কারণ হয়, দারিদ্র্যের কারণে বুদ্ধিনাশ ঘটে, লোকের কাছে প্রার্থনা অসম্মানের কারণ হয় আর (যেখানে-সেখানে অখাদ্য-কুখাদ্য) আহার গ্রহণ বংশগৌরব নাশের কারণ হয়।
.
। ৯০।
ফল এবং ছায়াযুক্ত বিশাল বৃক্ষের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। কেননা দৈববশতঃ তাতে ফল না থাকলেও ছায়া সবসময়ই পাওয়া যায়।
.
। ৯১।
জীবনের প্রথমভাগে (অর্থাৎ বাল্যে) যিনি বিদ্যা অর্জন করেননি, জীবনের দ্বিতীয়ভাগে (অর্থাৎ যৌবনে) যিনি ধন অর্জন করেননি, জীবনের তৃতীয়ভাগে (অর্থাৎ প্রৌঢ়দশায়) যিনি পুণ্য অর্জন করেননি- জীবনের চতুর্থভাগে (অর্থাৎ বার্ধক্যে) তিনি আর কী করবেন ? অর্থাৎ তখন আর কিছুই করণীয় থাকবে না।
.
। ৯২।
যে সকল বৃক্ষ নদীর পাড়ে, যে ধন অন্যের হস্তগত, যে কাজের কথা স্ত্রীলোক (কাজ হওয়ার আগেই) জেনেছে- এই সবই বিফল হয়।
.
। ৯৩।
কুদেশে গিয়ে অর্থসঞ্চয়ের আশা কোথায় ? কুপুত্রের জন্ম দিয়ে পরকাল পাওয়ার আশা কোথায় ? দুর্বিনীতা (অথবা দুশ্চরিত্রা) স্ত্রী লাভ হলে ঘরে সুখের আশা কোথায় ? দুর্বিনীত ছাত্রকে শিক্ষাদান করে যশের আশা কোথায় ?
.
। ৯৪।
কূপের জল, বটগাছের ছায়া, মধ্যযৌবনে উপনীত এমন স্ত্রী এবং ইটের তৈরি বাড়ি- এগুলি শীতকালে উষ্ণ থাকে আর গ্রীষ্মে থাকে শীতল (অর্থাৎ এগুলি সকল ঋতুতে সুখদায়ক হয়)।
.
। ৯৫।
রাত্রিতে ভ্রমণ বিষতুল্য, রাজার আনুকূল্য বিষতুল্য, যে স্ত্রী পরপুরুষের প্রতি আসক্ত সেই স্ত্রীও বিষতুল্য, যে ব্যাধিকে উপেক্ষা করা হয়েছে তাও বিষতুল্য।
.
। ৯৬।
যে বিদ্যার যথার্থ তাৎপর্য গৃহীত হয়নি- সে বিদ্যা বিষতুল্য, হজমের গণ্ডগোলে আহার বিষতুল্য, দরিদ্রের বহু সন্তান এবং আত্মীয়স্বজন থাকা বিষতুল্য, বৃদ্ধ লোকের তরুণী স্ত্রী বিষতুল্য।
.
। ৯৭।
সন্ধ্যাকালে পথ দেখা যায় না, চরিত্রহীন নারীর জীবন মৃত্যুর সমান, যে ক্ষেতে অতি সামান্য ফসল হয় তা কোন উপকারে আসে না, ভৃত্যের দোষে প্রভুর অপকারই হয়।
.
। ৯৮।
যে শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানে উচ্চবংশের ধার্মীক ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন না সেই শেষ কৃত্য অনুষ্ঠান নিষ্ফল, যে ধর্ম অনুষ্ঠানে দান করা হয়নি সেই অনুষ্ঠান বিফল, রূপ থাকলেও যে নারী বন্ধ্যা তার জীবন নিরর্থক, সেনাপতিবিহীন সৈন্যেরা নিষ্ফল, অর্থাৎ যুদ্ধে পরাভূত হয়ে থাকে।
.
। ৯৯।
যিনি ধর্ম গ্রন্থে পারদর্শী, যিনি সর্বদা ঈবাদত বন্দেগী করেন, যিনি সর্বদা রাজার মঙ্গল কামনা করেন- তিনিই রাজার ঈমাম।
.
। ১০০।
যিনি সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁর চরিত্র নির্দোষ, যিনি বিভিন্ন গুণে ভূষিত, যিনি সবল ধর্ম জ্ঞানে অভিজ্ঞ, যিনি প্রাজ্ঞ এবং ভৃত্য প্রভৃতি লোকনিয়োগে বিচক্ষণ- তিনিই বিচারক হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০১।
যে ব্যক্তি চিকিৎসাশাস্ত্রে   অভিজ্ঞ, যিনি সবলের চোখেই সৌম্যদর্শন, যিনি সৎস্বভাবিশিষ্ট- তিনিই চিকিৎসক হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০২।
যিনি কোন কথা একবার শুনলেই তার অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম, যিনি দ্রুত লিখতে পারেন, শব্দরাশি যার বশীভূত, সকল শাস্ত্র যার অধিগত- তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক বলে পরিগণিত হন।
.
। ১০৩।

যিনি সবলপ্রকার অস্ত্রশস্ত্র এবং শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, অস্র শস্র বহন করেও যিনি ক্লান্ত হন না, যিনি সাহস, পরাক্রম প্রভৃতি গুণযুক্ত- তিনিই সেনাপতি হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০৪।
তীক্ষ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন, সুবক্তা, বিচক্ষণ, অন্যের মনোগত ভাব অনুধাবন করতে সক্ষম, শান্ত, যথাযথভাবে বক্তব্য নিবেদন করতে সক্ষম- এরকম ব্যক্তিই যোগ্য দূত বলে বিবেচিত হন।
.
। ১০৫।
পুত্র-পৌত্র আছে এমন, পাকশাস্ত্রে নিষ্ণাত বা অভিজ্ঞ, যার তৈরি আহার মধুর আস্বাদযুক্ত, বলবান এবং দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তি উপযুক্ত পাচক বলে পরিগণিত হন।
.
। ১০৬।
যিনি লোকের মনোগত অভিপ্রায় অনুধাবন করতে সক্ষম, শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করে তার কারণ অনুমানে সক্ষম, যিনি সুন্দর আকৃতিবিশিষ্ট, যিনি সর্বদা সাবধানে থাকেন (তাই কখনও ভুল করেন না), যিনি সকল কাজে নিপুণ- তিনিই দ্বাররক্ষকের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হন।
.
। ১০৭।
যে ব্যক্তির নিজস্ব কোন বুদ্ধি নই শাস্ত্রোপদেশ তার কী কাজে লাগবে ? যে লোকের দুই চোখই নষ্ট- আয়নায় তার কী কাজ হবে ?
.
। ১০৮।
যে সভায় (যোগ্য) শ্রোতা নেই- বক্তা সেখানে কী করবেন ? (অর্থাৎ বক্তার পরিশ্রম নিরর্থক)। যে দেশে সকলেই উলঙ্গ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী- সে দেশে ধোপার কী কাজ ?

Tuesday, October 18, 2016

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য ও চাণক্য নীতি

চাণক্য নীতি কি ?চাণক্য কে ছিলেন, তিনি কি করতেন বা কেন তিনি এত নামীদামী ব্যক্তি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। অন্তত “ভারত চাণক্য নীতিতে চলে” বা “ভারতের পররাষ্ট্রনীতি চাণক্যকে অনুসরণ করে”- এই কথা আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখে অনেকবার শুনেছি। চানক্য আসলে কে বা কি তা এই প্রবন্ধ পড়লে আশা করি আপনার কাছে পরিষ্কার হবে।
চাণক্য (কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত) একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং ‘অর্থশাস্ত্র নামক’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।

চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চাণক্য ছিলেন একাধারে আমাদের এই উপমহাদেশের একজন নামকরা অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষক। অপরদিকে তিনি ছিলেন মৌর্য রাজের প্রধানমন্ত্রীও। আজ থেকে প্রায় তেইশ শত বছর আগে উনি তার শিক্ষাদান ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এই ভূমিতে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও বসবাস করতেন শ্মশানে; দেশীয় রাজদের বিদেশীদের হাত থেকে নিজ ভূমি উদ্ধারে উৎসাহ দিতেন, নিজে সামনে থেকে লড়তেন।
আবার উনি ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন; ওনাকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামে ডাকা হয়। আজ আমরা যারা ব্লগে, অথবা ফেসবুকে ছদ্মনামে লিখি, উনাকে তাদের গুরু বলা যেতে পারে। ক্ষমাসীনদের রক্তচক্ষু ও খড়গ হস্ত এড়ানোর জন্য ইন্টারনেটে ছদ্মনামে আজ যেসমস্ত উচিৎ কথার লেখালেখি হয়, তা উনি শুরু করেছিলেন সেই দুইহাজার তিনশত বছর আগে আজ তা আমরা করছি। নিশ্চয় আজকের মত তখনও তার কল্লা খুঁজে বেড়ানো হতো। এবং সেকালে গুমের সংস্কৃতি বা জেল জরিমানার প্রচলণ না থাকলেও ক্ষমতাধর রাজাদের যথাজ্ঞা পালন করার মানুষের অভাব ছিল না ?যেমনটি চলছে বর্তমানে ।
সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
চাণক্য কাহিনী
ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রাচীন পণ্ডিত অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন চাণক্য। এ উপমহাদেশ তো বটেই গোটা প্রাচ্যেই তাকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বাস্তববাদী পণ্ডিত মনে করা হয়। মহাকবি কালিদাস যুগেরও অনেক আগে আবির্ভূত এই পণ্ডিত তার সময়ে থেকেই ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন। লিখে গেছেন অমর সব তত্ত্বগাঁথা। চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০- খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩) ছিলেন প্রাচীন ভারতের পণ্ডিত, দার্শনিক ও রাজ উপদেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিহারের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ ছিলেন। মৌর্য রাজবংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজক্ষমতা অর্জন ও মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি চন্দ্রগুপ্ত ও পরবর্তীতে তার ছেলে বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ উপদেষ্টা ছিলেন। দার্শনিক প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটির জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়, যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবচর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। মহাজ্ঞানী চাণক্যের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বিষ্ণুগুপ্ত। এ ছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য'। কৌটিল্য নামেই তিনি সংস্কৃত ভাষার অমর গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' লিখে গেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা শাস্ত্র মানা হয়। যেহেতু তিনি 'কুটিলা গোত্র' থেকে উদ্ভূত ছিলেন তাই সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি 'কৌটিল্য' ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তার সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় নাম 'চাণক্য'-এর উদ্ভব 'চানকা' থেকে। চানকা হচ্ছে তার গ্রামের নাম। এই গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মতান্তরে পিতার নাম 'চানক' থেকে 'চাণক্য পণ্ডিত' হিসেবে সর্বত্র পরিচিত হয়ে উঠেন চাণক্য।
চাণক্য কী পরিমাণ জ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন তার শাস্ত্র পড়লেই সে সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, দার্শনিক, শাসক এবং কূটনীতিক ছিলেন। তার সমাজ ও জীবন সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো আজকের আধুনিক জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা। তার 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে তিনি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে ওঠে এবং পরিণতি লাভ করে। তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে একজন শাসককে নিজস্ব ভূখণ্ডের সীমানা পেরিয়ে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হয়। একইভাবে সম্পদ ও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নত করার জন্য কী কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে সেসব বিষয়ও পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করেন চাণক্য। তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি নামে অর্থশাস্ত্র হলেও এটি মূলত শাসকের উদ্দেশে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিবিষয়ক কৌশলের পরামর্শ। আর তৎকালীন সময়ের রাজা-মহারাজারা তাদের রাজদরবারে এ রকম একজন-দুজন পণ্ডিতকে সবসময়ই প্রাধান্য দিতেন। কাজেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এসব পণ্ডিতদের দারুণ ভূমিকা ছিল। সে অর্থে বলা যেতেই পারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পরবর্তীকালের রাজাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনকল্যাণমূলক রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে সমর্থ হয়েছিল। এর প্রমাণ পরবর্তী সময়ের প্রজাবৎসল শাসকদের রাজ্য শাসন ও রাজ্য পরিচালনা নীতি। স্পষ্টতই তাদের সে সময়ের শাসনে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বড় একটি ছাপ পড়েছে। চাণক্য-সহায়তায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের চবি্বশ বছরের শাসনকালের পরও দ্বিতীয় প্রজন্ম বিন্দুসারার সমৃদ্ধিময় জনপ্রিয়তা যাচাই করে। শুধু কী তারও পরে আরও পরিশীলিত আকারে কৌটিল্যের নীতির প্রভাব পড়ে ভারতবর্ষের শাসনকার্যে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মৌর্য বংশের তৃতীয় শাসক সম্রাট অশোকের শাসন। এই সময়টি এতটাই পরিশীলিত ছিল যে বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামেও প্রাচীন ও গভীর ঐতিহ্যবাহী অশোক-স্তম্ভের উপস্থিতি রয়ে গেছে। এমনকি পরবর্তীতে বিক্রমাদিত্যের শাসনকালের কিংবদন্তীয় উপকথাগুলোর জনপ্রিয় লোকভাষ্য থেকেও তা ধারণা করা যায় হয় তো। এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। তার এসব নীতি বেশকিছু বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এগুলোর ওই অর্থে প্রাচীন লিখিত রূপ না থাকলেও বিচ্ছিন্ন সব তত্ত্ব নিয়ে সংকলণ ঠিকই বেরিয়েছে। এ ধরনের একটি সংকলনের নাম 'চাণক্য নীতি দর্পণ'। তার কথাগুলো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন হলেও আজকের দিনে ঠিক একই তাৎপর্য বহন করে। চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, 'বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারও থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী-এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।' তিনি আরও বলেছেন- 'মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এ বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।' এমন দুটো কথা থেকেই অনুধাবন করা যায় জীবন সম্পর্কে চাণক্যের উপলব্ধি কতটা গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

চাণক্যের অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দবংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। এ পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্রগুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্রগুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে। চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পণ্ডিত হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় একটি অবস্থান ধরে রেখেছেন। টিকে আছেন তার কর্মবহুল জীবনের কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞানদান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ রকম জ্ঞানী একটি মানুষ কিন্তু শারীরিকভাবে খুব একটা সবল ছিলেন না। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিতের সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিকথাগুলো হাজার বছর পরও গুরুত্ব হারায়নি। আজো তা 'চাণক্য-শ্লোক' নামে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমরা প্রতিদিন কথার ফাঁকে এমন অনেক উক্তিই আওড়াই যেগুলো কার সেটি-ই হয়তো আমরা জানি না।.

আসুন জেনে নিই প্রাচীন ভারতের মহান কূটনীতিবিদ এবং তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আচার্য্য চাণক্যের কিছু অমর নীতি বাক্য:-


১. অপরের ভূল থেকে নিজে শিক্ষা নাও। কারণ, সবকিছু নিজের উপর প্রয়োগ করে শিখতে চাইলে তোমার আয়ু কম পড়বে।

২. কোনো ব্যক্তির খুব বেশী সহজ-সরল হওয়া উচিৎ নয়। কারণ, সোজা গাছ এবং সোজা মানুষদের প্রথমে কাটা হয়।

৩. যদি কোনো সাপ বিষধর নাও হয়, তবুও তার উচিৎ বিষধর হওয়ার ভান করা - যেন সে ইচ্ছা করলেই বিষাক্ত দংশন করতে পারে। একই ভাবে দুর্বল ব্যক্তিদেরও সবসময় নিজেদের দুর্বলতাগুলি লুকিয়ে রাখা উচিৎ।

৪. প্রত্যেক মিত্রতার পেছনে কোনো-না-কোনো স্বার্থ অবশ্যই থাকে। এটা একটা কটূ সত্য।

৫. কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার আগে সর্বদা নিজেকে এই তিনটি প্রশ্ন করবে- আমি এটা কেন করতে চলেছি? এর পরিনাম কী কী হতে পারে? আমার সফলতার সম্ভাবনা কতটা? যদি ঐ প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাও, তবেই কাজটা শুরু কর।

৬. একবার কোনো কাজ শুরু করার পর আর অসফল হওয়ার ভয় রাখবে না, এবং কাজ ছাড়বে না। যারা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে তারাই সবচেয়ে সুখী।

৭. সবচেয়ে বড় গুরুমন্ত্র হল, নিজের গোপন বিষয় অপরকে জানাবে না। এটা তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।

৮. কোনো কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা উচিৎ নয়। পরমূহুর্তে কী ঘটতে চলেছে তা কে বলতে পারে?

৯. যা ঘটে গেছে তা ঘটে গেছে। যে সময় অতীত হয়েছে সেটা নিয়ে ভেবে অনুশোচনা করে সময় নষ্ট করা অর্থহীন। যদি তোমার দ্বারা কোনো ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে শ্রেষ্ঠ করার চেষ্টা করা উচিৎ, যাতে ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

১০. কোনো দূর্বল ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা করা আরও বেশী বিপদের। কারণ, তারা এমন সময় এবং এমন জায়গায় আঘাত করতে পারে, যেটা আমরা কল্পনাও করিনি।

১১. অহংকারের মতো শত্রু নেই। সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।

১২. একটি দোষ অনেক গুণকেও গ্রাস করে।

১৩. ইন্দ্রিয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখ। ইন্দ্রিয়ের যে অধীন, তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।

১৪. সর্বদা চুপচাপ এবং গুপ্তরূপে কাজ করা উচিৎ।

১৫. যে ব্যক্তি নিশ্চিতকে ছেড়ে অনিশ্চিতের দিকে ধাবিত হয়, তার উভয়ই নষ্ট হয়।

১৬. অতি সৌন্দর্য্যের জন্য সীতার হরণ হয়েছিল, অতি গর্বের কারণে রাবণের পতন হয়েছিল এবং অতি দানী হওয়ার জন্য বলিকে পাতালে যেতে হয়েছিল। সুতরাং ‘অতি’-কে সর্বদা ত্যাগ করা উচিৎ।

১৭. ভয়কে কেবল ততক্ষণ ভয় কর, যতক্ষণ সেটা তোমার থেকে দূরে আছে।

১৮. তোমার প্রতিবন্ধকতাকে তোমারই পক্ষে কাজে লাগাও।

১৯. যদি তুমি অবস্থাকে তোমার পক্ষে আনতে না পার, তবে শত্রুদের জন্য তা জটিল করে দাও।

২০. যদি তুমি শক্তিশালী হও, তবে শত্রুকে দেখাও যেন তুমি দুর্বল। আর যদি তুমি দুর্বল হও, তবে শত্রুকে দেখাও যেন তুমি শক্তিশালী।

চার 'চাণক্য নীতি' যা নিজে জানুন, অপরকে জানাবেন না

চার এমন নীতির কথা চাণক্য বলেছেন, যা কখনই অন্যের সঙ্গে শলাপরামর্শ করা উচিত নয়।
আর্থিক ক্ষতির কথা
নিজের জীবনের আর্থিক ক্ষতির কথা কাউকে জানাবেন না। যদি আপনি অর্থ সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যান, তা নিজের মধ্যেই চেপে রাখুন। চাণক্যের মতে আর্থিক সঙ্কটের কথা জেনে কেউ আপনাকে সাহায্য করবে না, আপনার পাশে দাঁড়াবে না, দাঁড়ালেও তা হবে কপটতা। তাঁর মতে সমাজের দরিদ্র কখনই সম্মান পায় না।
ব্যক্তিগত সমস্যার কথা
নিজের কোনও সমস্যার কথা সর্ব সমক্ষে না বলাই চাণক্যের নীতি। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা গোপন রাখার কথাই বলেছেন চাণক্য। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা সবাই জানলে তা উপহাসিত হতে পারে। সবাই তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবে।
স্ত্রীর চরিত্রের কথা
অন্যের কাছে নিজের স্ত্রীর চরিত্র সবসময় লুকিয়ে রাখা চাণক্যের নীতিকথার অন্যতম একটি। বুদ্ধিমান ব্যক্তি এমনটাই করেন। যারা নিজের স্ত্রীকে নিয়ে সবার সামনে চর্চা করেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা এমন কিছু বলে ফেলেন, যা শোভনীয় নয়। যার পরিণতি ভয়ানক হতে পারে।
অবহেলিতদের থেকে অপমানিত হওয়ার কথা
অবহেলিতদের থেকে অপমানিত হওয়ার কথা গোপন রাখুন। চাণক্য মনে করতেন, এই ঘটনার বহিঃপ্রকাশ যে কোনও ব্যক্তিকে হাস্যকর উপদানে পরিণত করতে পারে। যা ওই ব্যক্তির গর্ববোধে আঘাত করবে, অহংকে আঘাত করবে।   
   

শত্রুর দাপটে দিশেহারা? জেনে নিন কী বলছে চাণক্য-নীতি

চাণক্য-নীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও প্রশ্নাতীত। কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য স্বয়ং এই নীতি রচনা করেছিলেন কি না, সে কথা অবান্তর। এই নীতিমালায় আসলে প্রতিফলিত হয়েছে শত শত বছরের ভারতীয় প্রজ্ঞা। যে কোনও সংকটে, যেকোনও সমস্যায় চাণক্যনীতির সরামর্শ রয়েছে। কোনও বিশেষ কালের প্রেক্ষিতে এই নীতীমালাকে দেখা যাবে না। আজ, এই কর্পোরেট-বিশ্বেও চাণক্য-নীতি সমান কার্যকর বলেই মনে করেন ম্যনেজমেন্ট গুরুরা।
শত্রুতা সভ্যতায় এক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। কোথা থেকে এবং কী করে শত্রুর উদয় ঘটে জীবনে, তা সব সময়ে বোঝা সম্ভব নয়। জীবনের কোনও বিশেষ পর্বে এসে দেখা যায়, তীব্র সব শত্রুতার শিকার হতে হচ্ছে। কখনও প্রতিদ্বন্দিতা, কখনও যৌন ঈর্ষা, কখনও বা বিনা কারণেই শত্রুতা মাথা চাড়া দেয়। শত্রু এবং শত্রুতা বিষয়ে চাণক্য-নীতি কী বলছে দেখা যাক।
•১। প্রতিটি সম্পর্কের পিছনে কোনও না কোনও উদ্দেশ্য কাজ করে। উদ্দেশ্যশূন্য সম্পর্ক হতে পারে না। বন্ধুত্ব এবং শত্রুতাও কোনও না কোনও উদ্দেশ্য দ্বারা প্রণোদিত। শত্রুতার ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্যটিকে বোঝার চেষ্টা করুন।
•২। শত্রুর ক্ষমতার সীমা রয়েছে। তারও দুর্বলতা রয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত শত্রুর দুর্বল দিকগুলি জানতে পারছেন, ততক্ষণ শত্রুর সঙ্গে সংঘাতে না-যাওয়াই ভাল। দুর্বলতা জানা গেলে তার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া যেতে পারে।
• ৩।শত্রুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়তেই পারেন। হারের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সন্ধির চেষ্টা করতে হবে বলে জানাচ্ছে চাণক্য-নীতি। নিজের দুর্বলতাকে ঢাকা দিতে সন্ধি সব থেকে সম্মানজনক ব্যবস্থা।
•৪। শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করা কর্তব্য। রাষ্ট্রের জন্য এমন ক্ষেত্রে কড়া গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে চাণক্য-নীতিতে। আর ব্যক্তিগত স্তরে প্রয়োজন সতর্কতার, একথাও বলছে চাণক্য-নীতি।


চাণক্য নীতি দর্পণ সারাংশ:

(১) যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।
(২) সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্যে সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বা’র ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। জলের নিচে মাছের গতিবিধি যেমন জল পান করে বা পান না করেও বোঝা সম্ভব নয়, অনুরূপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।”
(৩) বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী – এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।
৪) মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এই বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।
(৫) যারা পরিশ্রমী, তাদের জন্যে কোনকিছুই জয় করা অসাধ্য কিছু নয়। শিক্ষিত কোন ব্যক্তির জন্যে কোন দেশই বিদেশ নয়। মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।
(৬) বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।
(৭) মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।

উইকিপিডিয়াতে চাণক্য

চাণক্য
চাণক্য (সংস্কৃত: चाणक्य;   উচ্চারণ শুনুন (সাহায্য•তথ্য)) বা কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ)একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন।[৩] চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।[৪][৫][৬][৭] রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।[৮] চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।[৫] প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উৎস
চাণক্য সম্বন্ধে খুব সামান্যই ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, অধিকাংশ উৎসে ঐতিহাসিকতার তুলনায় কল্প কথা স্থান করে নিয়েছে। থমাস ট্রটমান চাণক্য ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সম্পর্ক নিয়ে চারটি উৎস চিহ্নিত করেছেন।এগুলি হল সিংহলী বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও তাঁর পালি টীকা বংসট্ঠপ্পকাসিনি, হেমচন্দ্র রচিত জৈন গ্রন্থ পরিশিষ্টপর্ব, সোমদেব রচিত কথাসরিৎসাগর ও ক্ষেমেন্দ্র রচিত বৃহৎকথামঞ্জরী নামক দুইটি কাশ্মীরি গ্রন্থ এবং বিশাখদত্ত রচিত সংস্কৃত নাটক মুদ্রারাক্ষস।
প্রথম জীবন
চাণক্য একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশটীকা অনুসারে, তক্ষশীলায় তাঁর জন্ম হয়।জৈন পুঁথি অদ্বিধন চিন্তামণি চানোক্যকে দ্রমিলা নামে অভিহিত করা হয়েছে, যার অর্থ তিনি দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী ছিলেন। হেমচন্দ্র রচিত পরিশিষ্টপর্ব গ্রন্থানুসারে, চাণক্য চণক নামক গ্রামে চণিন নামক এক ব্রাহ্মণ ও তাঁর পত্নী চণেশ্বরীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। অন্য উৎস মতে, চণক তাঁর পিতার নাম ছিল।
চাণক্য প্রাচীন ভারতের অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করেন ও পরবর্তীকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আচার্য্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বেদ সম্বন্ধে একজন পণ্ডিত  ছিলেন এবং বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।.
মৌর্য্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
বিশাখদত্ত রচিত মুদ্রারাক্ষস নাম্মক সংস্কৃত নাটকে নন্দ সাম্রাজ্য পতনে চাণক্যের ভূমিকা বর্ণিত রয়েছে। এই গ্রন্থানুসারে, হিমালয়ের একটি পার্বত্য রাজ্যের অধীশ্বর পর্বতেশ্বরের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা চাণক্য কূটনৈতিক মিত্রতা স্থাপন করে নন্দ সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। কিন্তু এই সময়, পর্বতেশ্বরকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হলে মলয়কেতু তাঁর স্থানে সিংহাসনে আরোহণ করেন। নন্দ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রাক্ষসের সঙ্গে মিলিত ভাবে মলয়কেতু নন্দ সাম্রাজ্যের অধিকৃত এলাকা দাবি করেন। শেষ নন্দ সম্রাট ধননন্দের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মলয়কেতুর সহায়তায় রাক্ষস রাজধানী আক্রমণ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এই পরিস্থিতিতে চাণক্য যেন তেন প্রকারে রাক্ষসকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাতে চেয়েছিলেন। রাক্ষসের প্রতীক মুদ্রাটি হস্তগত করে চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে উদ্দেশ্য করে একটি নকল চিঠি প্রস্তুত করেন। এই চিঠিতে রাক্ষসের মুদ্রার ছাপ (সীলমোহর) দিয়ে লেখা হয় যে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের শিবিরে যোগ দিতে ইচ্ছুক। চাণক্য প্রথমেই মলয়কেতুর নিকট এই চিঠির বিষয়ে বার্তা পাঠালে তাতে বিশ্বাস করে মলয়কেতু রাক্ষসের সঙ্গত্যাগ করেন। এই ভাবে চাণক্য রাক্ষসকে তাঁর সঙ্গীদের থেকে দূরে সরিয়ে দেন। পরবর্তী কৌশল হিসেবে তিনি রাক্ষসের বন্ধু চন্দনদাসের মৃত্যুদণ্ড দিলে রাক্ষস তাঁকে বাঁচাতে, আত্মসমর্পণে ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য হন।

বিন্দুসারের সঙ্গে সম্পর্ক
জৈন প্রবাদানুসারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উপদেষ্টা চাণক্য শত্রু দ্বারা বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিষেধক তৈরী করার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে তাঁর অজান্তে অল্প মাত্রায় বিষ পান করাতেন।একদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য তাঁর বিষযুক্ত খাবার অন্তঃসত্ত্বা দুর্ধরার সঙ্গে ভাগ করে খেলে, দুর্ধরার মৃত্যু হয়। তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে চাণক্য সদ্যমৃত দুর্ধরার পেট কেটে তাঁকে বের করে আনলে বিন্দুসারের জন্ম হয়।পরবর্তীকালে বিন্দুসার মৌর্য্য সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করলে চাণক্য তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব অনুসারে, বিন্দুসারের একজন মন্ত্রী সুবন্ধু চাণক্যকে অপছন্দ করতেন। তিনি বিন্দুসারকে জানান যে তাঁর মাতা দুর্ধরার মৃত্যুর জন্য চাণক্য দায়ী ছিলেন। এই ঘটনার কথা জানতে পেরে বিন্দুসার প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলে বৃদ্ধ চাণক্য জৈন আচার সল্লেখনা বা স্বেচ্ছা-উপবাস করে দেহত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই সময় চাণক্য যে তাঁর মাতার মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী ছিলেন না, তা অনুসন্ধান করে বিন্দুসার জানতে পেরে নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সুবন্ধুকে চাণক্যের নিকট পাঠান যাতে, চাণক্য তাঁর মৃত্যু সঙ্কল্প ত্যাগ করেন। কিন্তু সুযোগসন্ধানী সুবন্ধু এই সময় চাণক্যকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন।
রচনা
অর্থশাস্ত্র এবং চাণক্য নীতি নামক দুইটি গ্রন্থ চাণক্য রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কল্যাণকারী ভূমিকা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, শাসকের ভূমিকা সম্বন্ধে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে।[২২] অর্থশাস্ত্রের অধিকাংশ শ্লোকের রচয়িতা হিসেবে কৌটিল্যের নাম পাওয়া যায়, একটি শ্লোকে বিষ্ণুগুপ্তের নাম পাওয়া যায়। থমাস ট্রটমানের মতে, অর্থশাস্ত্রের রচয়িতার প্রকৃত নাম বিষ্ণুগুপ্ত ও গোত্র নাম কৌটিল্য।বিষ্ণুশর্মা রচিত পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থে চাণক্য ও বিষ্ণূগুপ্ত যে একই ব্যক্তির বিভিন্ন নাম, তা বলা হয়েছে।থমাস বারো ইত্যাদি কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, অর্থশাস্ত্র আসলে বেশ কিছু পুরনো রচনার সঙ্কলন এবং চাণক্য এই গ্রন্থের বেশ কয়েকজন লেখকের একজন, অর্থাৎ তাঁদের মতে চাণক্য ও কৌটিল্য ভিন্ন ব্যক্তি।

চাণক্য এর মোট ১০৮টি স্লোক ।

। ০১।
বিদ্যাবত্তা এবং রাজপদ কখনোই সমান হয় না। রাজা কেবলমাত্র নিজ রাজ্যেই সম্মান পান, বিদ্বান স্বদেশ-বিদেশ  সর্বত্র সম্মান পান।
.
। ০২।
পণ্ডিত ব্যক্তি সকল গুণের আর মূর্খ ব্যক্তি সকল দোষের আধার- এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই সহস্র মূর্খ অপেক্ষা একজন পণ্ডিত বিশিষ্ট বা অধিকতর গ্রাহ্য রূপে পরিগণিত হন।
.
। ০৩।
যে ব্যক্তি পরের স্ত্রীকে মাতৃজ্ঞানে দেখেন, পরের দ্রব্যকে মাটির ঢেলার মতো জ্ঞান করেন ।অর্থাৎ নির্লোভ থাকেন এবং সকল জীবে আত্মজ্ঞান পোষণ করেন- তিনিই যথার্থ জ্ঞানী।
.
। ০৪।
যে ব্যক্তি গুণহীন, তার উচ্চবংশে জন্মগ্রহণেও সার্থকতা কোথায় ? বিপরীতপক্ষে, যিনি বিদ্যান, তিনি উচ্চবংশে জন্মগ্রহণ না করলেও দেবতাদের দ্বারা পূজিত (সমাদৃত) হন।
.
। ০৫।
বিদ্যাহীন পুরুষ রূপযৌবনযুক্ত অথবা  উচ্চবংশজাত  হলেও গন্ধহীন পলাশ ফুলের মতো সমাদর লাভে সক্ষম হন না।
.
। ০৬।
চাঁদ তারকাদের অলঙ্কার, স্বামী নারীর অলঙ্কার, রাজা পৃথিবীর অলঙ্কার আর বিদ্যা সকলজনের অলঙ্কার।
.
। ০৭।
যে পিতামাতা তাঁদের পুত্রকে যথাযোগ্য শিক্ষা প্রদান করেননি, সেই পুত্রের কাছে মাতা এবং পিতা শত্রুরূপে পরিগণিত হন। কেননা হাঁসের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, তেমনি সেই পুত্রও বিদ্বান সমাজে স্থান পায় না।
.
। ০৮।
একটিমাত্র গুণবান পুত্র তুলনামূলকভাবে ভালো, কেননা শত মূর্খ পুত্রেও কোন কাজ হয় না। একটিমাত্র চন্দ্রই  রাতের অন্ধকার দূর করে, অসংখ্য তারা তা পারে না।
.
। ০৯।
সন্তানের পাঁচ বৎসর বয়স পর্যন্ত তাকে পিতা মাতা স্নেহে প্রতিপালন করবেন, তারপরের দশ বৎসর তাকে যথাযোগ্য শাসনে শিক্ষা দেবেন এবং পুত্রের ষোল বৎসর বয়স হলে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করবেন।
.
। ১০।
শৈশব অর্থাৎ জন্মাবধি পাঁচ বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে  অকারণে স্নেহ প্রদর্শন করলে অনেক দোষের সৃষ্টি হয়, উপযুক্ত শাসণ প্রদান করলে কিন্তু বহু গুণের জন্ম হয়। সুতরাং পুত্র এবং শিষ্যকে যেন যথাযোগ্য শাসন করা হয়, অতিরিক্ত স্নেহ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
.
। ১১।
যেমন সুগন্ধ ফুলে ভরা একটিমাত্র গাছের দ্বারাই সমগ্র বনভূমি সুগন্ধে  আমোদিত হয়, তেমনি একটিমাত্র সুপুত্রের দ্বারা সমগ্র বংশ গৌরবান্বিত হয়।
.
। ১২।
যেমন একটিমাত্র মরা শুষ্ক বৃক্ষের আগুনের দ্বারা সমগ্র বন দগ্ধ হয়, তেমনি একটিমাত্র কুপুত্রের দ্বারা সমগ্র কুল কলঙ্কিত হয়।
.
। ১৩।
মূর্খ ব্যক্তি দীর্ঘ পোশাক পরিচ্ছদে ভূষিত হয়ে দূর থেকেই শোভা পায়, যতক্ষণ পর্যন্ত মূর্খ কোন কথা না বলে ততক্ষণই শোভা পায়, কথা বললেই তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
.
। ১৪।
অমৃত বিষ থেকেও গ্রহণ করা চলে, সোনা অশুচি স্থল থেকেও গ্রহণ করা চলে, শ্রেষ্ঠ বিদ্যা নীচ ব্যক্তির কাছ থেকেও গ্রহণ করা চলে, রমণীশ্রেষ্ঠা নীচ কুল থেকেও গ্রহণ করা চলে।
.
। ১৫।
যে ব্যক্তি আনন্দানুষ্ঠানে, বিপদকালে, আকালের সময়, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, বিচারালয়ে অর্থাৎ মামলা-মোকদ্দমা চলাকালীন সাক্ষ্যাদির প্রয়োজনে)এবং শবদাহকালে পাশে উপস্থিত থাকেন, তিনিই প্রকৃত বন্ধু।
.
। ১৬।
যে ব্যক্তি সাক্ষাতে মিষ্ট কথা বলে কিন্তু অসাক্ষাতে কাজের ক্ষতি করে, সেরকম মুখে মধু অন্তরে বিষ বন্ধুকে ত্যাগ করা উচিত।
.
। ১৭।
যে ব্যক্তি একবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে এমন বন্ধুর সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্ব কামনা করে সে প্রকৃতপক্ষে মতো নিজের ধ্বংশ ডেকে আনে।
.
। ১৮।
অবিশ্বাসীকে কখনো বিশ্বাস করবে না এবং বন্ধুকেও অতিরিক্ত  বিশ্বাস করবে না। কেননা, বন্ধু কখনো কোনো কারণে  ক্ষুব্ধ হলে সে তোমার সকল দোষ অন্যের কাছে প্রকাশ করে দিতে পারে।
.
। ১৯।
ভৃত্যের যথার্থ স্বরূপ তাঁর কাজের মাধ্যমে জানবে, বন্ধুর যথার্থ স্বরূপ রোগাদি বিপদের সময়ে জানবে। মিত্রের যথার্থ স্বরূপ উপদ্রব উপস্থিত হলে জানবে এবং ধনসম্পত্তি নাশের কালে স্ত্রীর যথার্থ স্বরূপ জানবে।
.
। ২০।
হাতের কাঁটা দিয়ে যেমন পায়ে বেঁধা কাঁটা তোলা হয় তেমনি তোমার উপকার গ্রহণ করেছে এমন শত্রু দিয়ে অন্য শত্রুকে উচ্ছেদ করবে।
.
। ২১।
অকারণে কেউ কারো মিত্রও হয় না, শত্র“ও হয় না। কারণবশতঃই  প্রযোজনে কেউ কারো মিত্র বা শত্র“ বলে পরিগণিত হয়ে থাকে।
.
। ২২।
দুর্জন ব্যক্তি মিষ্টভাষী হলেও তা বিশ্বাসের ব্যাপার নয়। কেননা, তার জিভের ডগায় থাকে মধু- আর অন্তরে থাকে তীব্র বিষ।
.
। ২৩।
দুর্জন ব্যক্তি বিদ্যান হলেও তাকে ত্যাগ করা উচিত। কোনো সাপ মণিতে ভূষিত হলেও তা ভয়ঙ্করই থাকে।
.
। ২৪।
সাপের স্বভাব দংশন করা , দুর্জনেরও তাই। তবে দুর্জন সাপের চাইতেও বেশি ক্রূর। কেননা, সাপকে মন্ত্র কিংবা ওষধি দ্বারা বশে আনা যায়- কিন্তু দুর্জনকে কে নিবৃত্ত করবে ?
.
। ২৫।
নখযুক্ত প্রাণী, নদী, শিং আছে এমন প্রাণী, অস্ত্রধারী পুরুষ, নারী এবং রাজপুরুষকে কখনও বিশ্বাস করা উচিত নয়।
.
। ২৬।
হাতী থেকে হাজার হাত দূরে থাকবে, ঘোড়া থেকে একশ’ হাত দূরে থাকবে, শিংওয়ালা প্রাণী থেকে দশ হাত দূরে থাকবে আর দুর্জন লোক কাছে এলে সেই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে।
.
। ২৭।
বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য ধন-সম্পত্তি রক্ষা করবে, ধন সম্পত্তির বিনিময়েও স্ত্রীকে রক্ষা করবে, স্ত্রী বা ধন-সম্পত্তির বিনিময়েও নিজেকে সকল সময় রক্ষা করবে।
.
। ২৮।
পরের স্ত্রী, পরের জিনিস, পরনিন্দা, অন্যের প্রতি উপহাস এবং গুরুজনের সামনে চপলতা পরিত্যাগ করবে।
.
। ২৯।
কুল রক্ষার জন্য একজনকে ত্যাগ করা চলে, গ্রাম রক্ষার ন্য কুল ত্যাগ করা চলে, দেশ রক্ষার জন্য একটি গ্রাম ত্যাগ করা চলে আর নিজেকে রক্ষার জন্য  পৃথিবী ত্যাগ করা চলে।
.
। ৩০।
বুদ্ধিমান ব্যক্তি একপায়ে চলেন, আরেক পায়ে স্থির থাকেন। পরের জায়গা না দেখে আগের জায়গা ছাড়া উচিত নয়।
.
। ৩১।

লোভীকে টাকা-পয়সা দিয়ে, ক্রুদ্ধকে হাত জোড় করে, মূর্খকে তার মন জুগিয়ে এবং পণ্ডিতকে যথার্থ কথা বলে বশীভূত করবে।
.
। ৩২।
প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ধনক্ষয়, মনঃকষ্ট, নিজ বাড়ির অনাচার, বঞ্চনা এবং অপমানের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না।
.
। ৩৩।
সম্পত্তি এবং শস্য প্রভৃতির ক্রয়-বিক্রয় অথবা এই সব জিনিস ধার দিয়ে সুদের আদান-প্রদানের সময়, বিদ্যার্জনের সময়, খাওয়ার সময় এবং মামলা-মোকদ্দমার সময় সর্বদা লজ্জাশূন্য হওয়া উচিত অর্থাৎ এইসব ব্যাপারে লজ্জা করা উচিত নয়।
.
। ৩৪।
ধনবান ব্যক্তি, ধার্মীক উচ্চবংশ, রাজা, নদী এবং পঞ্চমতঃ চিকিৎসক - এই পাঁচজন যে দেশে বাস করেন না সেই দেশে বসবাস করা উচিত নয়।
.
। ৩৫।
যে দেশে গুণীর সম্মান নেই, জীবিকার ব্যবস্থা নেই, কোন বন্ধু নেই এবং বিদ্যার্জনের কোন ব্যবস্থা নেই- সেই দেশ পরিত্যাগ করা উচিত।
.
। ৩৬।
কাজের পরিকল্পনা মনে থাকবে- তা মুখে যেন প্রকাশ না পায়। কেননা, যে কাজের কথা অন্য লোক আগেই জেনে ফেলে- সেই কাজে সাফল্য আসে না।
.
। ৩৭।
বিচক্ষণ ব্যক্তির, রোগ-দুর্ভিক্ষ-পীড়িত দুর্যোগের দেশ, চুরি ,দুর্নীতি প্রভৃতি নিন্দনীয় জীবিকা, দুশ্চরিত্রা  অথবা রুগ্না স্ত্রী, খড়স্রোতা  নদী, খারাপ দ্রব্য এবং বাসী আহার্য বর্জন করবেন।
.
। ৩৮।
যেহেতু ঋণের অবশেষ, আগুনের অবশেষ, রোগের অবশেষ পুনরায় বাড়ে, সেহেতু এগুলির অবশেষ রাখবে না।
.
। ৩৯।
মানুষের জ্বর চিন্তা, প্রখর সূর্যতাপ কাপড়ের জ্বর, স্ত্রীর জ্বর স্বামীর সোহাগ না পাওয়া আর মৈথুন অশ্বের জ্বর।
.
। ৪০।
যাঁর পুত্র, ভৃত্য এবং স্ত্রী বশে আছে, অভাবের মধ্যেও যিনি প্রসন্ন থাকেন- তিনি এই পৃথিবীতে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে স্বর্গে আছেন।
.
। ৪১।
যাঁর স্ত্রী দুশ্চরিত্রা, বন্ধু প্রতারক, ভৃত্য মুখে মুখে উত্তর করে এবং যিনি সর্পযুক্ত গৃহে বাস করেন- তাঁর মৃত্যু অবধারিত- এ ব্যাপারে সংশয় নেই।
.
। ৪২।

যার ঘরে মা নেই অথবা যার স্ত্রী রুক্ষভাষিণী- তার বনে যাওয়া উচিত। কেননা তার পক্ষে বনও যা ঘরও তা-ই।
.
। ৪৩।
ঋণী পিতা, দুশ্চরিত্রা মাতা, অতিরূপবতী স্ত্রী এবং মূর্খ পুত্র শত্রুরূপে পরিগণিত হয়ে থাকে।
.
। ৪৪।
বিদ্যাহীনের জীবন শূন্য, বন্ধুহীনের সকল দিক শূন্য, পুত্রহীনের গৃহ শূন্য আর দরিদ্রের সকলই শূন্য।
.
। ৪৫।
কোকিলের কণ্ঠস্বরই তার রূপ, পাতিব্রত্যই স্ত্রীর রূপ, কুৎসিত পুরুষের বিদ্যাই রূপ এবং তপস্বীদের ক্ষমাই রূপ ।
.
। ৪৬।
বংশের দোষে কৃপণ হয়, কর্মের দোষে দরিদ্র হয়, মাতার বংশের ধারাবাহিকতায় পাগল হয় এবং পিতার দোষে মূর্খ হয়।
.
। ৪৭।
আগুনের কাছে জাতিভেদ নাই ।উচ্চবংশের ব্যক্তি অপর সকল মানুষের গুরু, নারীদের স্বামীই একমাত্র গুরু এবং সকল মানুষদের জন্য অতিথি গুরু।
.
। ৪৮।
অতিরিক্ত অহঙ্কারে লঙ্কা নগরী বিনষ্ট হয়েছিলো, অতিরিক্ত অভিমানের কারণে কৌরবেরা বিনষ্ট হয়েছিলো, অতিরিক্ত দানের ফলে রাজা বলি সত্যে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কোন কিছুরই অতিরিক্ত ভালো নয় ।
.
। ৪৯।
মানান সই পরিচ্ছদ ছাড়া অলঙ্কার শোভা পায় না, ঘৃত বিহীন আহার সুখকর হয় না, যে নারীর সুন্দর  স্তন নাই- সে নারী শোভা পায় না, বিদ্যাহীন জীবনও নিরর্থক।
.
। ৫০।
আহার্য দ্রব্য এবং তা হজম করার শক্তি থাকা, কামোপভোগের ক্ষমতা এবং সুন্দরী স্ত্রী থাকা, ধন-সম্পত্তি এবং দানের ইচ্ছা থাকা- এসব অল্প তপস্যার ফল নয়।
.
। ৫১।
পুত্রের জন্য স্ত্রীর প্রয়োজন, পিণ্ডদানের জন্য পুত্রের প্রয়োজন, হিতসাধনের জন্য বন্ধুর প্রয়োজন আর সব কিছুর জন্যই ধনের প্রয়োজন।
.
। ৫২।
যথার্থ বাক্য দুর্লভ, সুখকর পুত্র দুর্লভ, সমানগুণসম্পন্না স্ত্রী দুর্লভ, মঙ্গলকারী আত্মীয়স্বজন দুর্লভ।
.
। ৫৩।
সকল পর্বতে মাণিক্য মেলে না, সকল হাতীতে গজমুক্তা উৎপন্ন হয় না, সজ্জন পুরুষের সর্বত্র দেখা পাওয়া যায় না, সকল বনে চন্দন থাকে না।
.
। ৫৪।
জ্ঞানী নির্ধন হলেও শোচনীয় নন, যে ব্যক্তির বন্ধু পণ্ডিত তিনিও শোচনীয় নন, পুত্রপৌত্রের দ্বারা পরিপালিতা বিধবা নারীও শোচনীয় নন।
.
। ৫৫।
বিদ্যাহীন পুরুষ শোকের বিষয়, বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষের যে মিলনে সন্তান উৎপাদিত হয় না- তাও শোকের। করদাতা প্রজাসাধারণ যদি নিরাহার থাকে তবে তাও দুঃখের ।এ অবস্থায় অরাজক রাজ্যও দুঃখের।
.
। ৫৬।
শ্রেষ্ঠ বংশীয় পুরুষের সঙ্গে বিবাহাদি দ্বারা সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়েন না, পণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়েন না এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকেন এমন ব্যক্তি বিপদে পড়ে না।
.
। ৫৭।
পরাধীন জীবিকা কষ্টকর, নিরাশ্রয় ব্যক্তির পরগৃহে বসবাস কষ্টকর, ধনহীনের পক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কষ্টকর আর দারিদ্র্য সকল কষ্টের কারণ।
.
। ৫৮।
চোরের আবার ধর্ম কী ! দুষ্টের আবার ক্ষমা কী ! গণিকার আবার স্নেহ প্রেম  কী ! কামুকের আবার সততা কী !
.
। ৫৯।
ভৃত্যের আবার সম্মান কোথায় ! ক্রোধপরায়ণ ব্যক্তির আবার সুখ কোথায় ! স্ত্রীলোকের আবার সতীত্ব কোথায় ! আর দুষ্টের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব কোথায় !
.
। ৬০।
দুর্বলের রাজাই বল, শিশুর রোদনই বল, মূর্খের নীরব থাকাই বল আর চোরের মিথ্যাশ্রয়ই বল।
.
। ৬১।
যে ব্যক্তি নিশ্চিত বিষয় ত্যাগ করে অনিশ্চিতের আশ্রয় গ্রহণ করে, তার নিশ্চিত বিষয় নষ্ট হয় আর অনিশ্চিত তো নষ্ট হয়ই।
.
। ৬২।
শুকনো মাংস খাওয়া, বৃদ্ধা স্ত্রীর সঙ্গে মিলন, শরতের রোদ গায়ে লাগানো, সদ্য পাতা জমাট না হওয়া  দই  খাওয়া, ভোরে স্ত্রীসঙ্গম, ভোরে ঘুমানো- এই ছয়টি সদ্যপ্রাণঘাতক।
.
। ৬৩।
সদ্য কাটা হয়েছে এমন মাংস আহার, সদ্য প্রস্তুত অন্ন গ্রহণ, যুবতী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস, দুগ্ধপান, ঘৃতসেবন এবং ঈষৎ উষ্ণ জল পান- এই ছয়টি সদ্য সদ্যই প্রাণবর্ধক।
.
। ৬৪।
সিংহের কাছ থেকে একটি, বকের কাছ থেকে একটি, কুকুরের কাছ থেকে ছয়টি, গাধার কাছ থেকে তিনটি, কাকের কাছ থেকে পাঁচটি এবং মোরগের কাছ থেকে চারটি গুণ শেখার আছে।
.
। ৬৫।
যে ব্যক্তি ক্ষুদ্র বা মহৎ যে কোন কাজ করতে চান তিনি সেই কাজ খুব ভালোভাবে যত্নের সঙ্গে করবেন- সিংহের কাছ থেকে এই একটি শিক্ষণীয়ের কথা বিদ্বানেরা বলে থাকেন।
.
। ৬৬।
পণ্ডিত ব্যক্তি বকের মতো সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে অর্থাৎ বশীভূত রেখে স্থান-কাল-পাত্র বিচারপূর্বক যথাযথ কাজ করবেন- বকের কাছ থেকে ইন্দ্রিয় সংযত রাখার এই একটি শিক্ষণীয়ের কথা পণ্ডিতেরা বলে থাকেন।
.
। ৬৭।
প্রভুর মঙ্গলের জন্য সর্বদা চিন্তা, অল্পে সন্তুষ্টি, সহজে ঘুম আসা, তাড়াতাড়ি জেগে ওঠা, প্রভুভক্তি, সাহস- এই ছয়টি কুকুরের গুণ বলে জানবে, অর্থাৎ কুকুরের কাছ থেকে শিক্ষণীয় গুণ বলে জানবে।
.
। ৬৮।
গাধা বিশ্রামহীনভাবে ভার বহন করে, শীতে বা গরমে কষ্ট বোধ করে না এবং সকল সময়ই সন্তুষ্ট থাকে। গাধার কাছ থেকে এই তিনটি বিষয় শিক্ষণীয় আছে।
.
। ৬৯।
গোপনে মৈথুন ক্রিয়া, চটপটে ভাব, যথাকালে খাদ্যাদি সংগ্রহ, কখনো অসচেতন না থাকা এবং আলস্যহীনতা- এই পাঁচটি গুণ কাকের কাছ থেকে শিক্ষণীয়।
.
। ৭০।
আপ্রাণ যুদ্ধ, প্রত্যুষে নিদ্রাত্যাগ, পরিবারের সকলের সঙ্গে  অথবা  বন্ধুর সঙ্গে আহার গ্রহণ এবং বিপদাপন্ন স্ত্রীলোককে রক্ষা করা- মোরগের কাছে এই চারটি গুণ শিক্ষণীয় আছে।
.
। ৭১।
সক্ষম ব্যক্তির কাছে কোন কাজই কঠিন নয়, ব্যবসায়ীর কাছে কোন পথই দূর নয়, বিদ্বানের কাছে কোন দেশই বিদেশ নয় এবং মিষ্টভাষীর কাছে কেউই পর নয় ।
.
। ৭২।
ইন্দ্রিয়ের অসংযম সকল অনিষ্টের পথ, ইন্দ্রিয়ের জয় সকল উন্নতির পথ। যে পথে মঙ্গল, সে পথে চল।
.
। ৭৩।
বিদ্যার সমান বন্ধু নাই, ব্যাধির সমান শত্রু নাই, পুত্রস্নেহের সমান স্নেহ নাই এবং দৈবের সমান বল নাই।
.
। ৭৪।
পৃথিবীর আবরণ সমুদ্র, গৃহের আবরণ প্রাচীর, দেশের আবরণ রাজা আর স্ত্রীলোকের আবরণ চরিত্র।
.
। ৭৫।
স্ত্রীলোক ঘৃতপূর্ণ ঘটের সমান আর পুরুষ জ্বলন্ত আগুনের সমান। তাই পণ্ডিত ব্যক্তি ঘৃত এবং বহ্নিকে কখনোই একত্রে রাখবেন না (অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ সম্পর্করহিত স্ত্রী এবং পুরুষকে কখনোই এক জায়গায় রাখবেন না)।
.
। ৭৬।
স্ত্রীলোকের আহার পুরুষের দুই গুণ, পুরুষ অপেক্ষা তাদের বুদ্ধি চতুর্গুণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের বুদ্ধি পুরুষ অপেক্ষা ছয়গুণ আর কামশক্তি (অথবা ভোগলিপ্সা) পুরুষ অপেক্ষা আটগুণ- এরকম কথা শাস্ত্রে কথিত আছে।
.
। ৭৭।
যে আহারের পরিপাক হয়েছে তাকে প্রশংসা করবে, নির্দোষভাবে যৌবন অতিক্রম করেছে এমন স্ত্রীর প্রশংসা করবে, যুদ্ধ থেকে সসম্মানে ফিরে আসা বীরের প্রশংসা করবে এবং যে ফসল ঘরে উঠেছে তার প্রশংসা করবে।
.
। ৭৮।
উচ্চ বংশের ধার্মীক অসন্তুষ্ট হলে তাঁর আত্মিক উন্নতি হয় না, রাজা সন্তুষ্ট হলে তাঁর রাজ্য উন্নতি হয় না, বেশ্যা লজ্জাশীলা হলে তার আয় উন্নতি হয় না আর কুলবধূরা নির্লজ্জ হলে তাদের সতীত্ব থাকে না।
.
। ৭৯।
নীচবংশে জন্মগ্রহণ করে যদি কেউ রাজা হয়, কোন মূর্খের পুত্র যদি পণ্ডিত হয় অথবা কোন দরিদ্র যদি হঠাৎ প্রচুর সম্পত্তি লাভ করে তবে তারা এই জগৎকে তৃণের মতো তুচ্ছ জ্ঞান করে।
.
। ৮০।
যার প্রচুর ধনসম্পত্তি আছে সে যদি ব্রহ্মঘাতীও হয়, লোকে তাকে মেনে চলে, আর ধনসম্পত্তি না থাকলে চন্দ্রের মতো নির্মল বংশে জন্মগ্রহণ করলেও লোকে মান্য করে না।
.
। ৮১।
যে অধীত বিদ্যা পুঁথিতেই থেকে যায় (অর্থাৎ কাজে প্রয়োগের সময় মনে পড়ে না), যে ধন পরের হাতে চলে গেছে (অর্থাৎ নিজের অধিকারে নেই)- প্রয়োজনের সময় তা পাওয়া যায় না বলে সেই বিদ্যাকে বিদ্যা বলা চলে না, সেই ধনকে ধন বলা চলে না।
.
। ৮২।
বৃক্ষের ভয় ঝড়কে, পদ্মের ভয় শীতকালকে, পর্বতের ভয় বজ্রকে আর সজ্জনের ভয় দুর্জনকে।
.
। ৮৩।
রাজা যদি প্রাজ্ঞ ব্যক্তির উপর কার্যভার ন্যস্ত করেন তবে তাঁর তিনটি জিনিস লাভ হয়- যশ, স্বর্গলাভ এবং প্রভূত অর্থলাভ।
.
। ৮৪।
রাজা যদি মূর্খ লোকের হাতে কাজের ভার অর্পণ করেন তবে তিনি তিনটি দোষের ভাগী হন- নিন্দা, অর্থনাশ এবং নরকগমন।
.
। ৮৫।
পশুর মতো পরস্পর হিংসাদি স্বভাবের বহু মূর্খের দ্বারা সূর্য যেমন মেঘের দ্বারা আবৃত হয় তেমনি সকল গুণ আচ্ছাদিত হয়।
.
। ৮৬।
যে লোকের শস্যক্ষেত্র নদীর পাড়ে, যে লোকের স্ত্রী পরপুরুষে আসক্ত, যে লোকের পুত্রের বিনয় নেই, সেই লোকের জীবনধারণ মৃত্যুর সমান- এই ব্যাপারে সংশয় নাই।
.
। ৮৭।
পাথর জলে ভাসছে, বানর গান করছে- এইরকম অসম্ভব ঘটনা স্বচক্ষে ঘটতে দেখলেও বলা উচিত নয়।
.
। ৮৮।
যে কৃষকের ঘরে প্রচুর অন্ন থাকে- তার ঘরে সর্বদা সুখ বিরাজ করে, যার শরীরে রোগ নাই- সে সর্বদা সুখী, যে স্বামীর স্ত্রী প্রেমময়  প্রিয়তমা- সেই লোকের ঘরে সর্বদা উৎসবের আনন্দ।
.
। ৮৯।
অবহেলা কার্যনাশের কারণ হয়, দারিদ্র্যের কারণে বুদ্ধিনাশ ঘটে, লোকের কাছে প্রার্থনা অসম্মানের কারণ হয় আর (যেখানে-সেখানে অখাদ্য-কুখাদ্য) আহার গ্রহণ বংশগৌরব নাশের কারণ হয়।
.
। ৯০।
ফল এবং ছায়াযুক্ত বিশাল বৃক্ষের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। কেননা দৈববশতঃ তাতে ফল না থাকলেও ছায়া সবসময়ই পাওয়া যায়।
.
। ৯১।
জীবনের প্রথমভাগে (অর্থাৎ বাল্যে) যিনি বিদ্যা অর্জন করেননি, জীবনের দ্বিতীয়ভাগে (অর্থাৎ যৌবনে) যিনি ধন অর্জন করেননি, জীবনের তৃতীয়ভাগে (অর্থাৎ প্রৌঢ়দশায়) যিনি পুণ্য অর্জন করেননি- জীবনের চতুর্থভাগে (অর্থাৎ বার্ধক্যে) তিনি আর কী করবেন ? অর্থাৎ তখন আর কিছুই করণীয় থাকবে না।
.
। ৯২।
যে সকল বৃক্ষ নদীর পাড়ে, যে ধন অন্যের হস্তগত, যে কাজের কথা স্ত্রীলোক (কাজ হওয়ার আগেই) জেনেছে- এই সবই বিফল হয়।
.
। ৯৩।
কুদেশে গিয়ে অর্থসঞ্চয়ের আশা কোথায় ? কুপুত্রের জন্ম দিয়ে পরকাল পাওয়ার আশা কোথায় ? দুর্বিনীতা (অথবা দুশ্চরিত্রা) স্ত্রী লাভ হলে ঘরে সুখের আশা কোথায় ? দুর্বিনীত ছাত্রকে শিক্ষাদান করে যশের আশা কোথায় ?
.
। ৯৪।
কূপের জল, বটগাছের ছায়া, মধ্যযৌবনে উপনীত এমন স্ত্রী এবং ইটের তৈরি বাড়ি- এগুলি শীতকালে উষ্ণ থাকে আর গ্রীষ্মে থাকে শীতল (অর্থাৎ এগুলি সকল ঋতুতে সুখদায়ক হয়)।
.
। ৯৫।
রাত্রিতে ভ্রমণ বিষতুল্য, রাজার আনুকূল্য বিষতুল্য, যে স্ত্রী পরপুরুষের প্রতি আসক্ত সেই স্ত্রীও বিষতুল্য, যে ব্যাধিকে উপেক্ষা করা হয়েছে তাও বিষতুল্য।
.
। ৯৬।
যে বিদ্যার যথার্থ তাৎপর্য গৃহীত হয়নি- সে বিদ্যা বিষতুল্য, হজমের গণ্ডগোলে আহার বিষতুল্য, দরিদ্রের বহু সন্তান এবং আত্মীয়স্বজন থাকা বিষতুল্য, বৃদ্ধ লোকের তরুণী স্ত্রী বিষতুল্য।
.
। ৯৭।
সন্ধ্যাকালে পথ দেখা যায় না, চরিত্রহীন নারীর জীবন মৃত্যুর সমান, যে ক্ষেতে অতি সামান্য ফসল হয় তা কোন উপকারে আসে না, ভৃত্যের দোষে প্রভুর অপকারই হয়।
.
। ৯৮।
যে শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানে উচ্চবংশের ধার্মীক ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন না সেই শেষ কৃত্য অনুষ্ঠান নিষ্ফল, যে ধর্ম অনুষ্ঠানে দান করা হয়নি সেই অনুষ্ঠান বিফল, রূপ থাকলেও যে নারী বন্ধ্যা তার জীবন নিরর্থক, সেনাপতিবিহীন সৈন্যেরা নিষ্ফল, অর্থাৎ যুদ্ধে পরাভূত হয়ে থাকে।
.
। ৯৯।
যিনি ধর্ম গ্রন্থে পারদর্শী, যিনি সর্বদা ঈবাদত বন্দেগী করেন, যিনি সর্বদা রাজার মঙ্গল কামনা করেন- তিনিই রাজার ঈমাম।
.
। ১০০।
যিনি সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁর চরিত্র নির্দোষ, যিনি বিভিন্ন গুণে ভূষিত, যিনি সবল ধর্ম জ্ঞানে অভিজ্ঞ, যিনি প্রাজ্ঞ এবং ভৃত্য প্রভৃতি লোকনিয়োগে বিচক্ষণ- তিনিই বিচারক হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০১।
যে ব্যক্তি চিকিৎসাশাস্ত্রে   অভিজ্ঞ, যিনি সবলের চোখেই সৌম্যদর্শন, যিনি সৎস্বভাবিশিষ্ট- তিনিই চিকিৎসক হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০২।
যিনি কোন কথা একবার শুনলেই তার অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম, যিনি দ্রুত লিখতে পারেন, শব্দরাশি যার বশীভূত, সকল শাস্ত্র যার অধিগত- তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক বলে পরিগণিত হন।
.
। ১০৩।

যিনি সবলপ্রকার অস্ত্রশস্ত্র এবং শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, অস্র শস্র বহন করেও যিনি ক্লান্ত হন না, যিনি সাহস, পরাক্রম প্রভৃতি গুণযুক্ত- তিনিই সেনাপতি হওয়ার যোগ্য।
.
। ১০৪।
তীক্ষ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন, সুবক্তা, বিচক্ষণ, অন্যের মনোগত ভাব অনুধাবন করতে সক্ষম, শান্ত, যথাযথভাবে বক্তব্য নিবেদন করতে সক্ষম- এরকম ব্যক্তিই যোগ্য দূত বলে বিবেচিত হন।
.
। ১০৫।
পুত্র-পৌত্র আছে এমন, পাকশাস্ত্রে নিষ্ণাত বা অভিজ্ঞ, যার তৈরি আহার মধুর আস্বাদযুক্ত, বলবান এবং দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তি উপযুক্ত পাচক বলে পরিগণিত হন।
.
। ১০৬।
যিনি লোকের মনোগত অভিপ্রায় অনুধাবন করতে সক্ষম, শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করে তার কারণ অনুমানে সক্ষম, যিনি সুন্দর আকৃতিবিশিষ্ট, যিনি সর্বদা সাবধানে থাকেন (তাই কখনও ভুল করেন না), যিনি সকল কাজে নিপুণ- তিনিই দ্বাররক্ষকের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হন।
.
। ১০৭।
যে ব্যক্তির নিজস্ব কোন বুদ্ধি নই শাস্ত্রোপদেশ তার কী কাজে লাগবে ? যে লোকের দুই চোখই নষ্ট- আয়নায় তার কী কাজ হবে ?
.
। ১০৮।
যে সভায় (যোগ্য) শ্রোতা নেই- বক্তা সেখানে কী করবেন ? (অর্থাৎ বক্তার পরিশ্রম নিরর্থক)। যে দেশে সকলেই উলঙ্গ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী- সে দেশে ধোপার কী কাজ ?